হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের দাম ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী দীর্ঘসময় বন্ধ থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সাধারণ গ্রাহকদের জন্য জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার এই ঝুঁকি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরানে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় কেবল এক সপ্তাহেই গ্যালনপ্রতি তেলের দাম প্রায় ৪৪ সেন্ট বেড়ে ৫ ডলার ছাড়িয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার পার হওয়ায় মার্কিনিদের এখন দুশ্চিন্তা এই দাম আসলে কতদূর গিয়ে ঠেকবে এবং কতদিন পর্যন্ত দাম এমন চড়া থাকবে।
গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত তেলের দামের ওপর বারবার প্রভাব ফেলেছে। ২০০৩ সালের শুরুর দিকে প্রতি গ্যালন তেলের গড় দাম ছিল ১.৪৫ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল গ্যালন হিসেবে বিক্রি হয়। এক গ্যালন সমান ৩.৭৮৫ লিটার।
২০০৩ সালের মার্চে সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণ করলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলারে পৌঁছে যায় এবং প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১.৬০ ডলারে।
ওই সময় দাম ১.৭০ ডলারের ওপরে না উঠলেও তা ছিল বছরজুড়ে দাম বাড়ার কেবল শুরু, যা ২০০৮ সালের মধ্যে ৪ ডলার ছাড়িয়েছিল।
২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে ড্রোন হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর তেলের দাম আবারও আকাশচুম্বী হয়েছিল।
সে সময় অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৭০ ডলারে উঠে যায় এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় গ্যাসের দামও বাড়ে। তবে উত্তেজনা কমে আসায় সেই দাম বৃদ্ধি কেবল কয়েক দিন স্থায়ী হয়েছিল।
প্রশ্ন হল, এবারের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কেন তেলের দাম বাড়ে?
মধ্যপ্রাচ্যে হামলা হলে সাধারণত তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে দাম বেড়ে যায়। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার কারণে পারস্য উপসাগরে অনেক জাহাজ আটকা পড়েছে।
এসব জাহাজ প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল বহন করে, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে এ সময়ে নিরাপদে পার হতে পারছে না। ফলে তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তেল সরবরাহ করতে না পেরে অনেক বড় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সংঘাত এই যুদ্ধকালে তেলের উৎপাদন কমিয়েছে।
জ্বালানি তেলের বাজার বিশ্লেষক ও উপদেষ্টা টম ক্লোজা বলেছেন, চলতি পরিস্থিতির ফলে পাইকারি বিক্রেতারা আতঙ্কে আছেন, তাদের হয়ত মোটা অংকের মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়তে হতে পারে।
তেলের দাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে বিষয়টি নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালীতে তেলের সরবরাহ কতদিন বন্ধ থাকে তার ওপর। কারণ বিশ্বের মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
‘কিং অপারেটিং কর্পোরেশন’-এর সিইও জে ইয়ং বলেছেন, ট্রাম্পের করা আগের এক মন্তব্যের মতোই যদি এই যুদ্ধ যদি মাস গড়ায় তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, ‘গ্যাসবাডি’ বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেছেন, এ প্রণালীটি যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে তবে দাম ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে পরিচিত ধরন গ্যাসোলিনকে সংক্ষেপে গ্যাস বলা হয়। এর সঙ্গে জ্বালানি গ্যাসের কোনো সম্পর্ক নেই।
জে ইয়ং বলেছেন, “এর প্রভাব খুব দ্রুতই পড়তে শুরু করবে, যা উৎপাদিত বা কেনা তেলের জন্য অপেক্ষা করে না। দাম পাঁচ বা ছয় ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। কারণ এ পরিস্থিতি যদি আরও খারাপের দিকে যায় বা চলতেই থাকে তবে আমরা তেলের আরও চড়া দাম দেখতে পাব।”
অন্যদিকে, খনিজ তেলের বাজার বিশ্লেষক ও উপদেষ্টা টম ক্লোজা বলছেন, তেলের দাম ২০২২ সালের সেই রেকর্ড ৫.০২ ডলারে পৌঁছাবে না। ওই সময় বিশ্ববাজার ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্য অপরিশোধিত তেলের বড় উৎস হলেও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও তেলের সরবরাহকারী রয়েছে। তবে যে পরিস্থিতিই হোক না কেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে গেলে দাম কমে আসবে। তবে তা হয়তো আগের দামে পুরোপুরি ফিরবে না।





