সাবেক সতীর্থের চোখে মেসি: কোন জাদুতে তিনি সবার চেয়ে আলাদা
২০০৫ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনা দলে লিওনেল মেসি ছিলেন একেবারেই অপরিচিত এক মুখ। খুব কম লোকই তার নাম শুনেছিল, আর তার খেলা দেখেছিল আরও কম সংখ্যক মানুষ। বার্সেলোনার এই বিস্ময় বালককে আর্জেন্টিনা যুব দলে পরখ করার জন্য প্যারাগুয়ের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন সবার মনে একটাই কৌতূহল ছিল- এই মেসি আসলে কতটা ভালো?
আর্জেন্টিনার সেই যুব দলের অধিনায়ক পাবলো সাবালেতার কৌতূহলটা ছিল একটু বেশিই। দক্ষিণ আমেরিকান যুব চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২০০৫ সালের বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপের (অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ) প্রস্তুতি নিচ্ছিল আলবিসেলেস্তেরা। মেসি দলে আসার পর প্রথম অনুশীলন সেশনেই তার পায়ের জাদু দেখে সাবালেতাসহ বাকি ফুটবলাররা বুঝে যান, এই তরুণকে নিয়ে শোনা গল্পগুলো মোটেও অতিরঞ্জিত নয়।
মেসির ফুটবল মহিরুহ হয়ে ওঠার গল্পটা একেবারে শুরু থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সাবালেতা। পরবর্তীতে জাতীয় দলেও দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলেছেন দুজনে। আর্জেন্টিনার সাবেক এই ডিফেন্ডার বর্তমানে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের জন্য ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবালেতা খোলামেলা কথা বলেছেন মেসির ক্যারিয়ার ও তার অনন্য মানসিকতা নিয়ে।
২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নজর কাড়েন মেসি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্রুতই জায়গা করে নেন মূল জাতীয় দলে। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এখন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে নিজের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ৪১ বছর বয়সী সাবালেতার মতে, মেসির এই দীর্ঘ ও অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে তার ভিন্নধর্মী মানসিকতায়।
প্রথম দিককার অনুশীলনের স্মৃতি রোমন্থন করে সাবালেতা বলেন, আমরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছোট মাঠে ম্যাচ খেলতাম। মেসির দলে থাকা মানেই জয় নিশ্চিত! ওর সঙ্গে খেলতে আমি খুব উপভোগ করতাম। কিন্তু যখনই প্রতিপক্ষ হিসেবে ও সামনে আসত, তখন ডিফেন্ডারদের জীবন ও নরক বানিয়ে ছাড়ত। এত অল্প বয়সে এমন অতিমানবীয় প্রতিভা দেখাটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের ছিল।
শুরুর দিনগুলোতে মেসির লাজুক স্বভাবের কথা উল্লেখ করে সাবেক এই রাইট-ব্যাক জানান, মেসি প্রথমে খুব চাপা স্বভাবের ছিল। কাউকেই চিনত না বলে শুরুতে মন খুলে কথা বলত না, যা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ধীরে ধীরে দলের পরিবেশের সঙ্গে ও মানিয়ে নেয়। বিশেষ করে সের্হিও আগুয়েরোর সঙ্গে একই রুমে থাকাটা ওকে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দারুণ সাহায্য করেছিল। এরপর ও ধীরে ধীরে দলের নেতায় পরিণত হলো। যখন ও বুঝতে পারল যে দলের সবাই ওকে কতটা ভালোবাসে ও আগলে রাখে, তখন ও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট সাবালেতা মনে করেন, শুধু সহজাত প্রতিভা দিয়ে কেউ ইতিহাসের সেরা হতে পারে না। তার ভাষ্যমতে, আমি বিশ্বাস করি না যে খেলোয়াড়রা শুধুমাত্র জন্মগত দক্ষতার কারণে বিশ্বের সেরা হয়ে ওঠে। এর পেছনে আরও বড় কিছু থাকে। মেসির ক্ষেত্রে সেটা হলো, বছরের পর বছর ধরে নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার অফুরন্ত ক্ষুধা। ওর মানসিকতা অবিশ্বাস্য। ফুটবলের সম্ভাব্য সবকিছু জেতার পরও ওর মধ্যে কোনো আত্মতুষ্টি নেই।
৩৯ বছর বয়সে এসেও চলতি বিশ্বকাপে অতিমানবীয় ফর্মে আছেন মেসি। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে ৮টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৪টি গোল। দলের যে কোনো কঠিন মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে জ্বলে উঠছেন তিনি।
মেসির এই চিরসবুজ ফর্মের রহস্য জানিয়ে সাবালেতা বলেন, মেসি যেখানেই খেলেছে, সেখানেই সাফল্য পেয়েছে। ৩৯ বছর বয়সেও, এবং টুর্নামেন্টের আগে ফিটনেস নিয়ে নানা শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সে দেখিয়েছে মাঠে তার প্রভাব কতটা গভীর। সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। ফুটবলীয় সামর্থ্যের দিক থেকে সে অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে, কিন্তু যা তাকে অনন্য করে তুলেছে তা হলো নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সে বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় বসে আছে, কারণ সে শেখা ও নিজেকে উন্নত করা কখনো বন্ধ করেনি। ফুটবল ইতিহাসে এমন নজির খুব কমই আছে।




