হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন শর্ত ঘোষণা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার তিন দিন পর বিশ্বের তেল-গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের শর্ত ঘোষণা করার খবর দিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম।
ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, সদ্য স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আলোকে ‘উপসাগরীয় জলপথ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রকাশ করেছে।
‘উপসাগরীয় জলপথ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ সামাজিক মাধ্যম এক্স এ এক ঘোষণায় বলেছে, “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি পার হতে আগ্রহী সব পক্ষকে জানানো যাচ্ছে যে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে যেসব জাহাজ প্রয়োজনীয় শর্ত মেনে তাদের যাত্রার আবেদন জমা দেবে, তাদের পারাপারের ব্যবস্থা করা হবে।”
এতে আরও বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তাদের দেওয়া শর্ত মেনে ‘উপসাগরীয় জলপথ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’র কাছে আবেদন জমা দিলে আবেদনকারীদের জাহাজের পারাপার ‘দ্রুত সম্পন্ন করা হবে’।
‘উপসাগরীয় জলপথ ব্যবস্থানা কর্তৃপক্ষ’র কাছে আবেদন জমা দেওয়ার একটি ঠিকানা (PGSA.ir) দিয়ে বলা হয়েছে এটি ‘সরকারি ঠিকানা’ আর আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণের জন্য একটি ইমেইল অ্যাড্রেস (Info@PGSA.ir) দেওয়া হয়েছে।
‘উপসাগরীয় জলপথ ব্যবস্থানা কর্তৃপক্ষ’ আবেদনকারীদের জন্য ৫টি নির্দেশনা জারি করেছে, যেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছে তারা।
এতে বলা হয়েছে, পারাপারের আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের একমাত্র সরকারি মাধ্যম ওই ওয়েবসাইট ও ইমেইল। জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আবেদনের সঙ্গে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের তথ্য প্রদান করতে বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালির প্রবেশ বা বের হওয়ার মুখে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়াতে জাহাজ আসার নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রয়োজনীয় সব তথ্যসহ পারাপারের আবেদন জমা দেওয়া ‘বাধ্যতামূলক’। ৬০ দিনের এ সময়কালে কোনো জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনেরি ফি নেওয়া হবে না। নিরাপত্তা, সুরক্ষা, পরিবেশগত সেবা ও সংশ্লিষ্ট ইরানি বিমার খরচ ইরান সরকারের দায়িত্বে থাকবে।
সবশেষে বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতি ও নৌপথের সম্ভাব্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে নিরাপদ ও সুরক্ষিত চলাচল নিশ্চিত করতে প্রতিটি জাহাজকে যাত্রা শুরুর আগে নির্ধারিত রুট ও সময়সূচীর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। আর এ নির্দেশনা অমান্য করলে তার পূর্ণ দায়ভার জাহাজের মালিকের ওপর বর্তাবে।
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ফের সচল হওয়ার আশার মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম নেমে এসেছে ৮০ ডলারের নিচে।
শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বিশ্ব বাজারে ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি মূল্য ৪৩ সেন্ট বা ০.৫৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৯.৪২ ডলারে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি দাম ১৭ সেন্ট বা ০.২২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৬.৪৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার শন্তি চুক্তির খবরে দুই ধরনের তেলের দামই গত মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ঐতিহাসিক ওই চুক্তিতে সই করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি সৌদি ট্যাংকারসহ বেশ কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়। এসব ট্যাংকারে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।
তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও কিছু ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও সংঘাত অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিটি কতোদিন টিকবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
বাজারের জন্য আরেকটি উদ্বেগজনক লক্ষণ হল, সুইজারল্যান্ডে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক থেকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স শেষ মুহূর্তে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
তেল বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভান্দা ইনসাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বলেন, “বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারছে না।”



