সংসদে রেল ও সেতু খাত নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ট্রেনের অনলাইন টিকেট তিন মাসে ৭ হাজার ৮১০টি ‘সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট’ আটকে দেওয়ার কথা বলেছেন রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সোমবার জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, অনলাইনে টিকেট বিক্রির ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত সংখ্যক ‘পাসওয়ার্ড রিসেটের’ অনুরোধ বা বারবার পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলে সেগুলোকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
“গত তিন মাসে এ ধরনের ৭ হাজার ৮১০টি সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে ৪ হাজার ৩৩৪টি, এপ্রিলে ৪১৩টি এবং মে মাসে ৩ হাজার ৬৩টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়।”
রেলমন্ত্রী বলেন, ‘‘অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বে থাকা ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন’ এর সঙ্গে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী বছরের ২৪ মার্চ শেষ হবে।’’
“গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়ানো সাপেক্ষে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শতভাগ সার্ভার পরিচালনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।
হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও দেশের মহাসড়কে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নছিমন, করিমন ও ভটভটির মতো যানবাহন চলছে বলেও সংসদে তুলে ধরেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
রংপুর-৩ আসনের সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘‘এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।’’
‘দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল প্রায় ৫০ লাখ’
টাঙ্গাইল-৭ আসনের সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী জানান, বিআরটিএ ইনফরমেশন সিস্টেম অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি।
যেসব মোটরসাইকেলের নিবন্ধন নেই, সেগুলোর মালিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেবে বলে জানান তিনি।
এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, এমআরটি লাইন-২ এর রুট অ্যালাইনমেন্টে নারায়ণগঞ্জ শহরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই রুটের দৈর্ঘ্য হবে ৩০ দশমিক ৪০ কিলোমিটার।
একই প্রশ্নের জবাবে রবিউল আলম জানান, কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত উড়াল ও পাতাল সমন্বয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৪ নির্মাণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে।
তাদের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির (ডিটিসিএ) কাছে পাঠানোর পর পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।
অর্থায়ন সাপেক্ষে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে
মুন্সিগঞ্জ-১ আসনের সদস্য মো. আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তোলা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের লক্ষ্য সামনে রেখে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প প্রণয়নের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়া সাপেক্ষে প্রকল্পটির পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
৫ আগস্টের পর বন্ধ হওয়া ৯ সেতুর মধ্যে ২টিতে ফিরেছে টোল আদায়
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে দেশে ৬৭টি সেতুতে টোল আদায় করা হয়।
তিনি বলেন, টোল আদায় সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি উৎস এবং সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সেতুতে টোল আদায় চালু বা বন্ধ করতে পারে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর ৯টি সেতুতে টোল আদায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি সেতুতে টোল আদায় পুনরায় চালু করা হয়েছে। বাকি সাতটি সেতুতে এখনও টোল আদায় বন্ধ রয়েছে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সমীক্ষায় পরামর্শক নিয়োগ শেষ পর্যায়ে
জামালপুর-৩ আসনের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী বলেন, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
সেতু কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনায় ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ রয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। তাদের সঙ্গে দর কষাকষির কাজ শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই চুক্তি সই হবে।
সমীক্ষার ভিত্তিতে বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ অথবা গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট—এই দুই সম্ভাব্য অবস্থানের মধ্যে উপযুক্ত স্থানে সেতু নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি।
রেলওয়ের জমি ও ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিপুন রায় চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে রেলমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি ও ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ এর ওপেক্স মডেল অনুসরণ করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য আহ্বান করা হবে বেসরকারি বিনিয়োগ।
প্রথম ধাপে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেট রেলস্টেশনের খালি ছাদ এবং ঢাকায় রেলওয়ের অফিস ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্টেশন ও স্থাপনাকেও এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
সব রেললাইন একসঙ্গে ডাবল করা বাস্তবসম্মত নয়
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সদস্য নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে রেলমন্ত্রী বলেন, দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যান (২০১৬-২০৪৫) অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রেলপথগুলো পর্যায়ক্রমে ডাবল লাইনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক ও কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের সব রেললাইন একযোগে ডাবল করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ট্রাফিকের ঘনত্ব এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ধাপে ধাপে ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কুমারখালী স্টেশনে দুই ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিয়ে সিদ্ধান্ত পরে
কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে সুন্দরবন ও বেনাপোল এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতির দাবি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে রেলমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ওই দুটি আন্তঃনগর ট্রেন সেখানে থামে না।
তিনি বলেন, কোনো স্টেশনে নতুন যাত্রাবিরতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিকটবর্তী স্টেশনের দূরত্ব, বাণিজ্যিক গুরুত্ব, ট্রেনের বিদ্যমান স্টপেজ সংখ্যা, পরিচালনাগত প্রভাব এবং সময়সূচির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়।
এসব বিষয় পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সস্তা কৃত্রিম তন্তুর চাপে বিশ্ববাজারে ‘হুমকিতে পাটপণ্য’
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্য রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাপী স্বল্পমূল্যের কৃত্রিম তন্তুর সহজলভ্যতা ও ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে পাটজাত পণ্য বিশ্ববাজারে হুমকির মধ্যে পড়েছে।”
মন্ত্রী জানান, অধিকাংশ পাটকলে পুরোনো প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে। দেশে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব টেস্টের সুবিধা না থাকায় পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে রপ্তানিকারকরা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন।
বিজেএমসির ২৫ মিলের মধ্যে চালু ৯টি
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে পাটমন্ত্রী জানান, পাটের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষ হবে।
তিনি জানান, ২০২০ সালের ১ জুলাই সরকারি সিদ্ধান্তে বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি মিলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে এর মধ্যে ২০টি মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারাভিত্তিতে পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
ইতোমধ্যে ১৪টি মিলের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে; এর মধ্যে ৯টি মিল চালু হয়েছে।
বাকি ছয়টি মিল ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনটি মিলের বিপরীতে চূড়ান্ত প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে, একটি মিলের আগ্রহপত্র মূল্যায়ন চলছে, একটি মিলের জন্য আগ্রহপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং একটি মিলের ইজারা কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নতুন সরকারি পাটকলের পরিকল্পনা নেই
পাটমন্ত্রী জানান, বাকি মিলগুলোও সরকার ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা করছে।
ইজারার বাইরে থাকা পাঁচটি মিলের মধ্যে তিনটি সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়ায় এবং দুটি মামলাজনিত কারণে লিজের বাইরে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “সরকারিভাবে দেশে নতুন কোনো পাটকল স্থাপনের পরিকল্পনা নেই বরং সরকারি নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে এই সেক্টরে বেসরকারিখাতের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করাই সরকারের লক্ষ্য।”




