শিবিরের জিসানের গ্রেপ্তার নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে হট্টগোল
ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ জিসান মিয়াকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) সংসদে বাজেট অধিবেশন চলাকালে ধর্ষণ মামলার আসামি বহিষ্কৃত শিবির নেতা জিসানের অপহরণের ‘নাটক’ সাজানোসহ তাকে গ্রেপ্তার ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার ব্ক্তব্য ঘিরে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্যের সময় সরকারি দলের সদস্যদের তরফে আপত্তি ওঠে। এসময় বিরোধী দলের সদস্যরাও কথা বলতে শুরু করলে সংসদে হৈ চৈ শুরু হয়। এরমধ্যেই তাহের বক্তব্য চালিয়ে যান।
হট্টগোলের এক পর্যায়ে রুলিং দিতে বাধ্য হন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
এদিন সংসদে বাজেট অধিবেশনে কার্যপ্রণালী-বিধির ৩০০ অনুযায়ী প্রথমে দুবাইতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমদের গ্রেপ্তার, ইন্টারপোলের রেড নোটিস এবং তাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদকে অবহিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার বক্তব্য শেষে সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন দেন।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরেকটি বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি চাইলে ডেপুটি স্পিকার বলেন, সাধারণত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় যখন দাঁড়ান, তখন একদিকে শুধু টেবিল চাপড়া আসে। কিন্তু আজ দেখলাম সব দলের সকলে আপনাকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন কথা বলার জন্য।
বেনজীরের গ্রেপ্তারকে বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত সুখবর’ আখ্যা দিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এখন যদি আরেকটা এরকম সুখবর থাকে, অফকোর্স কনসিডারেশন।
পরে তিনি রসিকতার সুরে বলেন, বিষয়টা এইদিকেই তালি হবে, ওদিকে (বিরোধী দল) তালি হবে কিনা নিশ্চয়তা দিতে পারতেছি না। এদিকে যদি তালি না পড়ে, তাইলে তালি দিলে ভালো হবে।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপহরণের ‘নাটক’ সাজানো শিবির নেতা ও ধর্ষণ মামলার আসামি জিসান মিয়াকে গ্রেপ্তার ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বর্ণনা দিয়ে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বলতে চাননি। তবে একটি ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন হওয়ায় বিষয়টি সংসদকে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১১ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ জিসান মিয়া নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে ১২ জুন কুমিল্লার দাউদকান্দি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। ওই জিডির পর কুমিল্লা জেলা পুলিশের একাধিক দল অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের সময় জিসানের এক চাচাত ভাইয়ের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পারে পাঁচ-ছয় মাস আগে ফেইসবুকের মাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জিসান ওই নারীকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন এবং এতে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে জিসান ওই নারীকে ভ্রূণ নষ্ট করার জন্য চাপ দেন এবং রাজি না হলে হত্যার হুমকি দেন। একপর্যায়ে ওই নারী রাজি হলে তার পরিচিত সিকান্দার আলীর ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়। ওষুধ সেবনের পর ওই নারীর প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হলে বিষয়টি জিসানকে জানানো হয়। পরে আবারও একই ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে তার কাছে পাঠানো হয়। পরে ওই নারী বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান ১২ জুন বিয়ে করতে সম্মতি দেন। তবে তার আগের দিন ১১ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি আত্মগোপন করেন। তদন্তের একপর্যায়ে লাকসাম এলাকা থেকে জিসানকে উদ্ধার করা হয়। পরে ওই নারী থানায় হাজির হয়ে জিসানকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণ, ধর্ষণে সহযোগিতা এবং ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে আরও ৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলার দুই আসামি সজীব হাসান ও সিকান্দার আলীকেও গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, তারা (গ্রেপ্তার দুজন) আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, অনেকেই ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি অন্যভাবে বর্ণনা করে সরকারকে দায়ি করতে চেয়েছিল। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পরে আমরা মনে করলাম এই ঘটনা জাতির সামনে প্রকাশ করা দরকার। আমি এই মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এটা প্রকাশ করলাম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর কথা বলার সুযোগ চান বিরোধীদলীয় উপনেতা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
প্রথমে বেনজীর আহমদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় পুলিশকে অভিনন্দন দিলেও জিসানকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকারকে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরবর্তী পর্যায়ে যে সাবজেক্টটা বলেছে, আপনার এটার অনুমতি দেওয়া উচিত হয়নি।একটি অমীমাংসিত ও বিতর্কিত বিষয়ে সংসদে এরকম বক্তব্য রাখা, কোনো একটি দলকে… বাংলাদেশের পার্লামেন্টের ইতিহাসে এই প্রথম বলেই আমি মনে করি। এটা মনে হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি দলকে অভিযুক্ত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছেন।
জিসানের অবস্থান ও মামলার তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তাহের বলেন, কুমিল্লার পুলিশ জিসানের সঙ্গে কাউকে কথা বলতে দিচ্ছে না। সাংবাদিকদের দেখা করতে দিচ্ছে না। যে মেয়েটার কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গেও কাউকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এটা কেন? এখানে কোনো প্লট তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন আসে।
তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ারও দাবি তোলেন।
তাহেরের বক্তব্যের সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা নিজ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন। কয়েকজন সদস্য সরাসরি প্রতিক্রিয়াও দেখান। এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে সংসদে হট্টগোল শুরু হয়।
এ পরিস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটা আমাদের দেশের সর্বোচ্চ জায়গা। আমরা সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেব। অনেক কথা বলা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। যদি সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে কিছু হয়ে থাকে, সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবু হট্টগোল চলতে থাকলে ডেপুটি স্পিকার বারবার সদস্যদের আসনে বসার অনুরোধ করেন এবং বলেন, আমরা কোনো বিতর্কে যেতে চাচ্ছি না। দিনের কার্যসূচিতে যাচ্ছি।
তিনি রুলিং দিয়ে বলেন, ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে বিরোধীদলীয় উপনেতার উত্থাপিত আপত্তি পরীক্ষা করে দেখা হবে। পরে ডেপুটি স্পিকার দিনের কার্যসূচিতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।




