জানাজা শেষে সংসদের আঙিনায় সমাহিত জমির উদ্দিন সরকার
প্রবীণ রাজনীতিবিদ, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজা শেষে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে তাকে দাফন করা হয়েছে।
রোববার বাদ আসর সংসদ ভবনের টানেলে পাঁচবারের এই সংসদ সদস্যের জানাজা হয়। জানাজার পরে সাবেক স্পিকারের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এ জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তা টানেলে হয়।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এএসএম বাহাউদ্দিন প্রথমে জমির উদ্দিন সরকারের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধ জানান।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সাবেক স্পিকারের কফিনের পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এরপর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদসহ জ্যেষ্ঠ নেতা এবং সংসদ সদস্যদের নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য জমির উদ্দিন সরকারের কফিনে শ্রদ্ধা জানান।
পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির নেতৃত্বে হুইপরা এবং সংসদ সচিব গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা সাবেক স্পিকারের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এর আগে সংসদ নেতা তারেক রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বড় ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংসদ সচিবালয়ে কর্মচারীরা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নেন।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জানাজার শুরুতে জমির উদ্দিন সরকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
জানাজায় অংশ নেওয়া সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, “জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের একজন কৃতি সন্তান। তার মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের প্রত্যেক সদস্য বিহ্বল ও ভারাক্রান্ত হয়েছেন।”
তিনি বলেন, ব্যক্তিজীবনে জমির উদ্দিন সরকার ‘অমায়িক ও সজ্জন’ ছিলেন। সাধারণ মানুষের জন্য তিনি ছিলেন ‘নিবেদিতপ্রাণ’।
সাবেক এই স্পিকার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘আস্থাভাজন’ ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন হাফিজ উদ্দিন। তিনি জমির উদ্দিন সরকারের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জমির উদ্দিন সরকারের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
বাদ জোহর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের জমির উদ্দিন সরকারের জানাজা শেষে তার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। সেখানে আরেক দফা জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংসদ ভবনের কবরস্থানে সমাহিত করা হয় সাবেক এই স্পিকারকে।
পরে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের যেখানে ছয়জন ব্যক্তি ও রাজনীতিকের কবর রয়েছে, সেখানে তাকে দাফন করা হয়।
রোববার ভোরে শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জমির উদ্দিন সরকার; তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জমির উদ্দিন সরকারের জন্ম। আইন পেশায় তিনি সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পান।
ছাত্রজীবনে, ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতির যুক্ত হন।
জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল গঠন করলে তাতে যোগ দেন জমির উদ্দিন সরকার। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। আমৃত্যু তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।
২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে শপথ নেন জমির উদ্দিন সরকার। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্বে ছিলেন।
২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
এর আগে জিয়াউর রহমানের সময় গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং খালেদা জিয়ার সরকারে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন জমির উদ্দিন সরকার।




