অর্ধেকে নেমেছে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন
গ্রীষ্মের শুরুতেই চট্টগ্রাম মহানগরী এবং বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যুতের লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ছয় থেকে থেকে সাত ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা। নগরীর এনায়েত বাজার এলাকায় মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চারবার বিদ্যুত গেছে। আর প্রতিবারে লোডশেডিংয়ের সময়কাল এক ঘণ্টার কম ছিল না।
নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার শিববাড়ি এলাকায় মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ গেছে পাঁচবার। ওই এলাকার বাসিন্দা বিনয় ভৌমিক বললেন, কখনো এক ঘণ্টা, কখনো দেড় ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুতের এ সমস্যা বেশি চলছে। তীব্র গরমে ঘরের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরে থাকা শিশু ও বয়স্করা দুর্ভোগে পড়ছেন বেশি।
শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ে মাত্রা আরো বেশি। বিকাল থেকে রাতে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং মানুষেরে ভোগান্তি বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা দারুণ বিপাকে পড়েছে।
পিডিবি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং বেশি করতে হচ্ছে।
পিডিবি চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ২৪টি। এরমধ্যে ছয়টি সরকারি, বাকি ১৮টি বেসরকারি মালিকানাধীন।
এর মধ্যে মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও বাঁশখালীতে দুটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, পাঁচটি গ্যাসভিত্তিক, একটি জলবিদ্যুৎ এবং দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ফার্নেস অয়েল দিয়ে চলে।
এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিতরণ অঞ্চল (দক্ষিণ) গঠিত। এ অঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১৩ শ থেকে ১৪ শ মেগাওয়াট। কিন্তু দেশের অন্যান্য এলাকার চাহিদা মেটাতে গিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রাম সরবরাহ পায় প্রয়োজনের চেয়ে কম।
পিডিবি চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ) একেএম মামুনুল বাশার বলেন, “আমাদের বিদ্যুতে সংকট রয়েছে, সে কারণে শহর-গ্রাম সবখানেই নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তেল-গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদনও কমে গেছে।
সোমবারে অফপিক আওয়ারে (বেলা ১১টা) উৎপাদন ছিল ২১৫২ মেগাওয়াট, আর পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৭টা) বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ২৩৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে দিনে ৬৭ মেগাওয়াট এবং রাতে ছিল ১০৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
এর আগে রোববার দিনে উৎপাদন নেমে আসে ২০০৯ মেগাওয়াটে, আর সন্ধ্যায় এ পরিমাণ ছিল ২৩৪২ মেগাওয়াট। সেদিন রাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৫৮৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলেছে ১৪৫৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিং ছিল ১২৭ মেগাওয়াট।
গত শুক্রবার চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলো থেকে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৮৮৫ মেগাওয়াট, অফপিক আওয়ারে তা নেমে আসে ১৩৮০ মেগাওয়াটে। লোডশেডিং ছিল সকালে ৯০ ও সন্ধ্যায় ৮৪ মেগাওয়াট।
তার আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে উৎপাদন নেমে আসে ১০১১ মেগাওয়াটে, আর সন্ধ্যায় ছিল ১৮০৪ মেগাওয়াট। সেদিন সাকলে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ মেগাওয়াটে। রাতে এ পরিমাণ ছিল ৬৭ মেগাওয়াট।
গত এক সপ্তাহের মধ্যে গত ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ ১৭০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য মিলেছে। দিনে-রাতে মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্য দিচ্ছে পিডিবি, তবে ভোক্তাদের ধারণা, লোডশেডিং হচ্ছে আরও বেশি।
চট্টগ্রাম মহানগরীর চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়রে পরিমাণ আরও বেশি। পটিয়া উপজেলার কেলিশহর গ্রামের বাসিন্দা কাজল দে বলেন, দিন ও রাত মিলিয়ে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
পিডিবি চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সারাদেশে বিদ্যুতের যে অবস্থা আমাদের চট্টগ্রামেও একই অবস্থা। চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবার পর আমাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেয়। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ না পেলে আমরা লোডশেডিং করে থাকি।”
পিডিবি চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোতে তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে যেতে পারছে না। রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিট গ্যাসের অভাবে বন্ধ আছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুই থেকে তিনটি কেন্দ্র পানির অভাবে নিয়মিত বন্ধ থাকছে। ফার্নেস অয়েল দিয়ে চলা দোহাজারী ও হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট তাদের সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। শুধুমাত্র মাতারবাড়ি ও বাঁশখালীতে অবস্থিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পিক ও অফ পিক আওয়ারে মোটামুটি সক্ষমতার কাছাকাছি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে।
দোহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের ম্যানেজার মো. আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, গত চার-পাঁচদিন তেল সংকটের কারণে উৎপাদন কমে গিয়েছিল। আমাদের ছয়টি ইঞ্জিনের মধ্যে চারটি পুরোদমে উৎপাদনে আছে। রক্ষণাবেক্ষণেল জন্য বাকি দুটিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
প্রতিটি ইঞ্জিনে ১৭ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ফার্নেস অয়েল এসেছে, এখন আমাদের উৎপাদন বাড়বে।
চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলো এই অঞ্চলের চাহিদার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও নিয়মিত বিরতিতে লোডশেডিংয়ের কারণ জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, কোন এলাকায় কী পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে, তা জাতীয়ভাবেই নির্ধারণ করা হয়। এখানকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে অঞ্চলভেদে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া হয়।
পিডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি থাকলেও দেশের অন্য কোনো জেলায় কোনো কেন্দ্র নাও থাকতে পারে। সেসব এলাকাতেও বিদ্যুৎ দিতে হবে। আবার মহানগরী এলাকায় মফস্বলের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। সে কারণে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি।
গ্যাস ও ফার্নেস তেলের সংকট কাটিয়ে উঠলে চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বাড়বে এবং লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।




