চিরবিদায় সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে, যে জাদুতে ছিলেন প্লেব্যাক সুপারস্টার
জাদুকরী কিছু কণ্ঠে ভর করে গড়ে উঠেছে ভারতের প্লেব্যাক মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রি, আবার কিছু কণ্ঠ তাকে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে কালজয়ী। রোববার অনন্তলোকে পাড়ি জমানো আশা ভোঁসলে ছিলেন দ্বিতীয় দলে।
৯২ বছরের জীবনের আটটি দশক ভারতীয় উপমহাদেশের কয়েক প্রজন্মের শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন এই শিল্পী। সংগীতের নানা ধারায় বিচরণ করলেও তাকে কখনো স্রেফ ট্রেন্ডের পেছনে ছুটতে হয়নি।
গত শতকের ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ৭০ ও ৮০-র দশক পর্যন্ত আশা ভোঁসলে ছিলেন একপ্রকার অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই তার ভিন্ন মেজাজের কণ্ঠের কাজ শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তার কালজয়ী কাজগুলো ব্যাপক সাফল্য এনে দেয়।
এনডিটিভি লিখেছে, ৬০ ও ৭০-এর দশকের আধুনিক ও পশ্চিমা প্রভাবিত সংগীতের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভারতীয় সংগীত জগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন আশা ভোঁসলে।
কণ্ঠের যে জাদু আশা ভোঁসলেকে করে তোলে প্লেব্যাক সুপারস্টার
প্রাণবন্ত গজল থেকে শুরু করে ক্যাবারে কিংবা রক অ্যান্ড রোল—সবখানেই অবাধ বিচরণ তাকে ‘কুইন অব ভার্সেটাইল’ খেতাব এনে দেয়।
তিনি প্রথার বাইরে গিয়ে নিজের চলার পথ বেছে নিয়েছিলেন সচেতনভাবেই। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বড় বোন প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তার তুলনা হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। লতার কণ্ঠ ছিল কোমল ঘরানার। এর বিপরীতে আশা ভোঁসলে তার কণ্ঠশৈলীতে নিয়ে আসেন ক্ষিপ্রতা ও বৈচিত্র্যময় গায়কী ভঙ্গি।
কিছুটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠ তাকে এমন অনেক চরিত্রের জন্য গান গাওয়ার সুযোগ এনে দেয়, যেগুলো ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে।
হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের জন্য বরাদ্দ প্রচলিত কণ্ঠধারাকে তিনি বদলে দেন, যা হয়ে ওঠে আধুনিক ভারতীয় নারীর প্রতীক। আর এভাবেই জন্ম হয় এক প্লেব্যাক সুপারস্টারের।
অস্ফুট ফিসফাস, খিলখিল হাসি কিংবা মৃদু গুঞ্জন–যে কোনো কিছুকেই তিনি সংগীতের রূপ দিতে পারতেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি অদম্য ঝোঁকের কারণেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে জায়গা করে নেন আশা ভোঁসলে।
১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে এক সংগীত পরিবারে আশা ভোঁসলের জন্ম। তিনি থিয়েটার অভিনেতা ও শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী দীনানাথ মঙ্গেশকরের মেয়ে এবং কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন।
জীবনের শুরু থেকেই তার ওপর ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকারের গুরুভার, তবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির সংকল্পে তিনি ছিলেন অটল।
ইনডিয়া টুডে লিখেছে, ১৯৪০-এর দশকে সিনেমার প্লেব্যাক শুরু করার পর তিনি প্রায়ই এমন সব গান গাইতেন যা অন্যরা ফিরিয়ে দিতেন। খ্যাতি মিলবে কি না, সেই নিশ্চয়তা ছিল না, কিন্তু আশা ভোঁসলে নিরলস কাজ করে গেছেন।
তার দীর্ঘ সংগীতযাত্রা কোনো একটি নির্দিষ্ট শিখরে আটকে থাকেনি, বরং বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তিনি।
‘রিদমের রাজা’ হিসেবে পরিচিত ওপি নায়ার থেকে শুরু করে বৈপ্লবিক আরডি বর্মণ—আশা ভোঁসলে প্রতিটি সুরকারের চাহিদা অনুযায়ী নিজের গায়কশৈলীকে বদলে নিয়েছেন।
আশার দরাজ কণ্ঠ ওপি নায়ারকে মুগ্ধ করেছিল, আর তাদের জুটির কাছ থেকে স্বতন্ত্র ও ছন্দময় কিছু গান উপহার পায় হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।
‘আইয়ে মেহেরবান’ (হাওড়া ব্রিজ, ১৯৫৮) এবং ‘ইয়ে হ্যায় রেশমি জুলফন কা আন্ধেরা’ (মেরে সানাম, ১৯৬৫) গানগুলো সে সময়ের আধুনিকতা, ছন্দ ও ভঙ্গিমার জন্য বিশেষভাবে আলাদা হয়ে ওঠে।
নির্দিষ্ট কোনো প্লেব্যাক গানের ছাঁচে নিজেকে আটকে না রেখে আশা ভোঁসলে ক্যাবারে, লোকগীতি, রোমান্টিক সুর, এমনকি পরে গজলেও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন সাবলীলভাবে।
আরডি বর্মণের সঙ্গে তিনি জ্যাজ রিফ এবং ল্যাটিন বিটের সংমিশ্রণে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। তাদের দীর্ঘ সৃষ্টিশীল অংশীদারত্ব এবং পরে বিয়ে আশা ভোঁসলের শিল্পীসত্তাকে আরও বিস্তৃত করে।
১৯৬৬ সালে ‘তিসরি মঞ্জিল’ (১৯৬৬) সিনেমায় ‘আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা’র মত চার্টবাস্টার গান উপহার দেন আশা, যা ছিল সেই সময়ের বিচারে এক দুঃসাহসী পশ্চিমা নিরীক্ষা।
সেই সিনেমার ‘ও হাসিনা জুলফন ওয়ালি’, ‘উমরাও জান’ (১৯৮১) সিনেমার আকুতিভরা ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’, কিংবা ‘ইজাজত’ (১৯৮৭) সিনেমার গভীর আবেগের গান ‘মেরা কুছ সামান’ কেবল তার বহুমুখী কাজের নমুনা নয়, বরং সিনেমার আবেগী ভাষার ওপর তার নিখুঁত দখলেরও প্রমাণ।
জনমানুষের শিল্পী হিসেবে আশার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। একই সময়ে তিনি একদিকে যেমন ‘পিয়া তু আব তো আজা’র (ক্যারাভান, ১৯৭১) মত আবেদনময় ক্যাবারে গান রেকর্ড করতে পারতেন, আবার মুহূর্তেই ‘দম মারো দম’ (হরে রাম হরে কৃষ্ণা, ১৯৭১) গেয়ে হিপ্পি মেজাজে চলে যেতে পারতেন।
আবার ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’ কিংবা ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ (উমরাও জান, ১৯৮১)-এর মত গজলে তিনি যখন তার কণ্ঠের দক্ষতা ও আবেগের গভীরতা ঢেলে দেন, তখন তা আরও একবার সংগীত মহলে বিস্ময় জাগায়।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ৬২ বছর বয়সে এ আর রহমানের সঙ্গে ‘রঙ্গিলা রে’ (রঙ্গিলা, ১৯৯৫) গেয়ে আশা ভোঁসলে প্রমাণ করেন, তিনি প্রতিটি প্রজন্ম ও সময়ের সঙ্গে সমান সাবলীল।
আশা ভোঁসলে প্রায়ই বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, তিনি কখনো নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা করেননি; যা সামনে এসেছে, সেটাই গেয়েছেন। তার কাছে গান গাওয়া ছিল সাধনা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি ‘রেওয়াজ’ বা অনুশীলনকে ‘নিশ্বাসের মত’ অপরিহার্য বলেছিলেন, যা বন্ধ করলে তার নিজেকে ‘অপূর্ণ’ মনে হত।
তিনি বলেছিলেন, “শ্বাস না থাকলে মানুষ যেমন মারা যায়, সংগীতও তেমনি আমার কাছে শ্বাসবায়ু। আমি সারা জীবন এই ভাবনা নিয়েই কাটিয়েছি। সংগীতকে অনেক কিছু দিয়েছি। কঠিন সময় কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি ভেবে ভালো লাগে। অনেক সময় মনে হয়েছে, আমি বোধহয় টিকতে পারব না, কিন্তু আমি পেরেছি।”
ইনডিয়া টুডে লিখেছে, গান যেমনই হোক, তা কণ্ঠে তুলতে আশা ভোঁসলের নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সংগ্রাম এবং সেইসব সিদ্ধান্তের কথা তিনি অকপটে বলতেন, যা তাকে ইন্ডাস্ট্রিতে আলাদা জায়গা করে দিয়েছিল।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, টিকে থাকার তাগিদে তিনি সব ধরনের গান গেয়েছেন এবং একসময় সেই গানের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন।
সাত দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে আশা ভোঁসলে বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। হিন্দি সিনেমার গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি আঞ্চলিক চলচ্চিত্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কাজ করেছেন।
তার অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালের পদ্মবিভূষণ। পরে তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উৎসাহিত করতে প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, যা তার মহানুভবতারই পরিচয় দেয়।
পুরস্কার থেকে কেন সরে দাঁড়ালেন? ফিল্মফেয়ারের এমন প্রশ্নের উত্তরে আশা ভোঁসলে বলেছিলেন, “ফিল্মফেয়ার পুরস্কারগুলো বেশিরভাগ সময় দিদি (লতা মঙ্গেশকর), মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার আর আমার কাছেই আসত। নতুন নারী শিল্পীরা সুযোগ পাচ্ছিল না।
“তাছাড়া আমার মনে হত, একটা পুরস্কারজয়ী গান আসলে একটা দলগত প্রচেষ্টার ফল। ভালো গান লেখা এবং সুর করার কৃতিত্বও অনেক। তাই একা সব কৃতিত্ব বা ট্রফি নিয়ে নেওয়াটা আমার কাছে অবিচার মনে হত।”
নারীকণ্ঠের প্লেব্যাক কেমন হওয়া উচিত–তার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। যে সময় কণ্ঠশৈলী নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির অবস্থান ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল, সেই সময় তিনি গানে টেক্সচার, দুষ্টুমি আর কথ্যভঙ্গির সাবলীলতা নিয়ে আসেন। সবখানেই তিনি নীরবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ করে নিয়েছেন।
তার ব্যক্তিগত জীবনেও এই দৃঢ়তার প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে মাতৃত্বের সঙ্গে কঠিন ক্যারিয়ারের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছেন তিনি।
ইনডিয়া টুডে লিখেছে, “ভারতীয় চলচ্চিত্রের পাতায় আশা ভোঁসলের কণ্ঠ চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। তিনি শিখিয়ে গেছেন, দীর্ঘস্থায়ী হওয়া মানে সবসময় একরকম থাকা নয়, বরং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের পথ খোলা রাখা।
“তার জীবনের গল্পটি বিশাল, যা প্রতিধ্বনিত হয় তারই গানে— ‘আগে ভি জানে না তু’।”




