রামপুরার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় পিছাল
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় হতাহতের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় পিছিয়ে গেছে।
বুধবার এ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ থাকলেও প্রসিকিউশন নতুন করে ডিজিটাল প্রমাণ জমা দেওয়ার আবেদন করায় চার সপ্তাহ সময় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ বুধবার প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ওই আবেদন করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন – বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। নতুন প্রমাণ দাখিলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য চার সপ্তাহ সময় চান তিনি।
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম শুনানিতে বলেন, “নতুন করে ডিজিটাল এভিডেন্স আমাদের কাছে এসেছে। আমরা আদালতে পেশ করব বলে সময় প্রার্থনা করছি।”
তবে আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী এদিন শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন না। সে কারণে ট্রাইব্যুনাল তাৎক্ষণিকভাবে রায়ের বা পরবর্তী শুনানির চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ না করে বিষয়টি অপেক্ষমাণ রেখেছে। বুধবার দুপুরেই এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইসিটি ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ৯(৪) ধারা এবং বিধিমালার ৪৬ নম্বর বিধান অনুযায়ী. গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলামত বাদ পড়েছে বলে মনে হলে প্রসিকিউশন তা যে কোনো পর্যায়ে অতিরিক্ত প্রমাণ (অ্যাডিশনাল এভিডেন্স) হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।’
গত ২৩ ফেব্রুয়ারিতে ট্রাইব্যুনালে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যেসব মামলার তদন্ত ‘সঠিক হয়েছে’ বলে মনে হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর যেসব ক্ষেত্রে তদন্তে ‘ঘাটতি আছে’ মনে হয়েছে, সেগুলোতে তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।’
তার যোগদানের আগেই রামপুরার মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এসেছিল। সে কথা তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘মামলাটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে তার নজরে আসে যে, আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের একটি ‘এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশনের’ ভিডিও রেকর্ডিং রয়েছে। সেখানে তিনি কীভাবে গুলি করেছেন, কার নির্দেশে করেছেন-এসব বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ওই ভিডিওটি ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।’
“এমন একটি শক্ত আলামত উপস্থাপন করা প্রয়োজন,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এ কারণে ট্রাইব্যুনালের কাছে ওই ভিডিও অতিরিক্ত প্রমাণ হিসেবে টেন্ডার করার আবেদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল এখনও সিদ্ধান্ত দেয়নি। প্রসিকিউশন চার সপ্তাহ সময় চেয়েছে এবং ডিফেন্সও সময় প্রার্থনা করেছে।”
ভিডিওটি আগে কেন উপস্থাপন করা হয়নি–সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম বলেন, এটি কবে পাওয়া গেছে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন, তবে সম্প্রতি তার নজরে এসেছে। প্রমাণ উপস্থাপনের সময় বিস্তারিত জানানো হবে।
রামপুরা মামলায় নতুন করে সাক্ষ্য গ্রহণের প্রয়োজন হবে কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রমাণটি সরাসরি উপস্থাপন করা যাবে, সেক্ষেত্রে আসামিপক্ষকে নোটিস দিলেই হবে।’
আগে ভিডিওটি উপস্থাপন না করা গাফিলতি কি না–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটি ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে, কিংবা আলামতটি পরে পাওয়া হয়ে থাকতে পারে।”
তিনি দাবি করেন, আগের সাক্ষ্যগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং নতুন প্রমাণ সেগুলোকে ‘আরও শক্তিশালী’ করবে।
চলমান অন্য মামলাগুলোতেও তদন্ত সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “নির্দিষ্ট মামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। কিছু মামলায় প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে দুয়েকটি মামলা অধিকতর তদন্তে পাঠানো হতে পারে।”
এদিকে মতিঝিলের তৎকালীন এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তার হাতে এখনও আসেনি তদন্তের অংশ হিসেবে পরে বিষয়টি দেখা হবে।’
রায় পেছানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সবকিছু করা হচ্ছে, এতে প্রশ্ন ওঠার কিছু নেই।”
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে রাজধানীর রামপুরায় একজনকে আহত ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলা করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন কেবল রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার।
আর ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ‘খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভুঁইয়া পলাতক।’
গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ করে। ওইদিন চঞ্চলের পক্ষে খালাস চেয়েছিলেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। অন্যদিকে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দিসহ নথিপত্রে এ মামলার পাঁচ আসামির সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চায় প্রসিকিউশন।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রায় ঘোষণার চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি দিন রেখেছিল ট্রাইব্যুনাল। সেদিন জানানো হয়, এ মামলার রায় হবে ৪ মার্চ। তবে বুধবার তা পিছিয়ে গেল।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন আমির হোসেন নামের এক তরুণ। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়।
এক পর্যায়ে ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকলেও তার ওপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন এক পুলিশ সদস্য। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। একই দিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নাদিম ও মায়া ইসলাম।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এ মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।





