আন্ডার ওয়ার্ল্ডের হুমকিতে ফের আতঙ্কিত বলিউড, শাহরুখকেও হত্যার হুমকি
নব্বইয়ের দশক ও চলতি শতকের শুরুর দিকে বলিউডে ব্যাপক প্রভাব ছিল আন্ডার ওয়ার্ল্ডের। তারকা থেকে শুরু করে পরিচালক ও প্রযোজক—অনেকেই অপরাধী চক্রের হুমকি ও চাপের মুখে ছিলেন। সম্প্রতি টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনা সেই আতঙ্কের দিনগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের একের পর এক হুমকি ও হামলার ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, বলিউড কি আবারও সেই পুরোনো সন্ত্রাসের যুগে ফিরে যাচ্ছে?
এনডিটিভি জানিয়েছে, ওই সময়ে চাঁদাবাজি, এলাকা দখলের লড়াই এবং আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি হয়েছিল। টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমার, প্রযোজক মুকেশ দুগ্গাল, জাভেদ রিয়াজ সিদ্দিকী ও অজিত দিওয়ানিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে, চলচ্চিত্র পরিচালক রাকেশ রোশন, রাজীব রাই ও লরেন্স ডি’সুজা পরিকল্পিত হামলার পর অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের হুমকির মুখে সালমান খান পড়ার বহু বছর আগেই আরেক সুপারস্টার শাহরুখ খান মুখোমুখি হয়েছিলেন মুম্বাইয়ের আন্ডার ওয়ার্ল্ডের। গ্যাংস্টার আবু সালেমের নিশানায় ছিলেন শাহরুখ। হুমকির মাত্রা এতটাই গুরুতর ছিল যে, মুম্বাই পুলিশ আশঙ্কা করেছিল, অপরাধীরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। বলিউডের ইতিহাসে ঘটনাটি অন্যতম উদ্বেগজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সম্প্রতি প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক অনুপম চোপড়ার লেখা ‘কিং অব বলিউড: শাহরুখ খান’ বইয়ে শাহরুখসহ বলিউডের অন্য তারকাদের ওপর আন্ডার ওয়ার্ল্ডের প্রভাব ও হুমকির নানা ঘটনা উঠে এসেছে। বইয়ের এসব ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রায় চার বছর ধরে শাহরুখকে আবু সালেমসহ বিভিন্ন গ্যাংস্টার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ওই সময়ে তাঁকে মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হয়।
অনুপম চোপড়ার বইয়ে বলা হয়েছে, যশ চোপড়ার ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ সিনেমার কাজ চলাকালীন আবু সালেমের ফোন পেয়েছিলেন শাহরুখ। সালেম তাঁকে নিজের গ্যাংয়ের পছন্দমতো সিনেমায় কাজ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
কিন্তু শাহরুখ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কারও নির্দেশে তিনি সিনেমা করবেন না, কোনো অনুষ্ঠানেও অংশ নেবেন না। বইয়ে উদ্ধৃত তাঁর বক্তব্য, “আমি কারও ফরমায়েশ মত কোনো সিনেমা করব না, কোনো অনুষ্ঠানও করব না। আমি পাঠান—চাইলে গুলি করে দাও।”
আবু সালেমকে উদ্দেশ করে শাহরুখ আরও বলেছিলেন, “আপনি কাকে গুলি করবেন, সেটা নিয়ে আমি কোনো কথা বলি না। তাই আমি কোন সিনেমা করব, তা আপনি আমাকে বলতে পারেন না।”
আরেক জায়গায় তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে এভাবে, “আমি যেমন তোমাকে বলি না কাকে গুলি করতে হবে, তেমনি আমাকেও বলো না কোন ছবিটা করতে হবে।”
হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের নির্দেশে কাজ করতে রাজি নন—এমন বার্তাই দিয়েছিলেন শাহরুখ।
সালেমের সঙ্গে শাহরুখের কথোপকথনের বিস্তারিতও উঠে এসেছে বইটিতে। মুম্বাইয়ের প্রচলিত কথ্য ভাষায় সালেম জানতে চান, ‘হ্যাঁ, কী ব্যাপার, কী চলছে?’
শাহরুখ পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কে বলছেন?’ এরপর হিন্দিতে গালিগালাজ শুরু করেন সালেম। শাহরুখ অবশ্য পাল্টা গালাগাল করেননি। নম্রভাবে ইংরেজিতে তিনি জানতে চান, ‘কী সমস্যা, স্যার?’
সালেম জানান, তিনি শুনেছেন, একজন মুসলিম প্রযোজকের সিনেমায় কাজ করতে আপত্তি জানিয়েছেন শাহরুখ। এ কারণে তিনি ক্ষুব্ধ।
জবাবে শাহরুখ জানান, সালেমের কাছে পৌঁছানো তথ্য সঠিক নয়। তিনি বেশ কয়েকজন মুসলিম পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে সালেম বলেন, “লোকে বলে তোর খুব অহংকার, কিন্তু তুই একজন ভদ্র মানুষ। আমি তোকে মারব না।”
তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা রাকেশ মারিয়া শাহরুখকে কিছুদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর চলাচলও সীমিত রাখতে বলা হয়। নায়কের নিরাপত্তায় সাদা পোশাকে স্পেশাল অপারেশনস স্কোয়াডের একজন কমান্ডোকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
অনুপম চোপড়ার বই ছাড়াও ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের টিভি সিরিজ ‘হট ওয়াক্স’-এর জন্য কমেডিয়ান ও অভিনেত্রী রুবি ওয়াক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের হুমকি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন শাহরুখ।
নব্বইয়ের দশকের সেই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে বলিউড যখন অনেকটাই স্বস্তিতে ছিল, তখন লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের উত্থান পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সালমান খানকে লক্ষ্য করে দীর্ঘদিনের হুমকি, বাবা সিদ্দিকী হত্যা এবং সম্প্রতি টাইগার শ্রফের ওপর হামলার ঘটনা বলিউডে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। হামলাকারীরা সালমান ছাড়াও অমিতাভ বচ্চন, অক্ষয় কুমার ও আমির খানসহ আরও কয়েকজন তারকাকে নজরে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রের শুটিং সেট ও স্টুডিওতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।




