উগ্রবাদ মোকাবিলায় প্রমাণভিত্তিক ও মানবকেন্দ্রিক গবেষণার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
দেশে সহিংস উগ্রবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা, সামাজিক বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা মোকাবিলার মতো জটিল সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে কার্যকর ও প্রমাণভিত্তিক উপায়ে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা।
তারা বলছেন, গবেষণার মূল উদ্দেশ্য কেবল আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রবন্ধ প্রকাশ, উদ্ধৃতি (সাইটেশন) বাড়ানো কিংবা গবেষকের ব্যক্তিগত ও পেশাগত প্রোফাইল সমৃদ্ধ করা হতে পারে না। সমাজের বাস্তব সমস্যা অনুধাবন ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মাধ্যমেই গবেষণার প্রকৃত সার্থকতা নিশ্চিত করতে হবে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় মানবকেন্দ্রিক ও প্রমাণভিত্তিক নীতি’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রজেক্টের আওতাধীন ‘ইন্টার-রিলিজিয়াস ডায়ালগ, রিজিলিয়েন্স বিল্ডিং অ্যান্ড কাউন্টারিং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম’ উপ-প্রকল্পের অংশ হিসেবে এটি যৌথভাবে আয়োজন করে ঢাবির ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি পলিসি ল্যাব এবং বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ।
সম্মেলনে প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতাকে শুধু নিরাপত্তা বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর পেছনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের গবেষকদের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।’
এ সময় ক্যাম্পাস ও শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাস ও সামাজিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্ত সংলাপের পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। তার মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার যথাযথ সমন্বয় ঘটাতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘উগ্রবাদ কেবল একটি নিরাপত্তা সংকট নয়, এটি সমাজের পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিময় সহাবস্থানের প্রতি বড় হুমকি।’
উগ্রবাদের আবেদন কীভাবে প্রশমিত করা যায় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দেন তিনি। ঢাবি উপাচার্য আশ্বাস দেন, প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর নীতি প্রণয়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা করবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক উদীয়মান অনলাইন র্যাডিকালাইজেশনের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তরুণদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করা এবং অনলাইন জুয়া বা সাইবার অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।’
অপরাধীদের দমনে কেবল বলপ্রয়োগ সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রেপ্তার অপরাধীদের মুখোমুখি হয়ে যৌক্তিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের ভুল আদর্শ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করি। একাডেমিয়া ও পুলিশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে এই অপরাধগুলো প্রতিরোধ করা সহজ হবে।’
সম্মেলনের মূল বক্তা হিসেবে যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. গর্ডন ক্লাব এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাব এনাম খান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আবু সায়েমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী নুরুল ইসলাম ও হিট উপ-প্রকল্পের এসপিএম ড. মো. দিদারুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ভারত, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা সাইবার স্পেস, এআই-ভিত্তিক উগ্রবাদ, কমিউনিটি রিজিলিয়েন্স ও ডিজিটাল প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিষয়ে তাদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ইউএনডিপির প্রতিনিধি এবং ঢাবির শিক্ষার্থীরা এতে সশরীরে অংশ নেন।




