সরোয়ারের এমপি দায়িত্ব পালনে বাধা নেই, জামায়াত প্রার্থীর আবেদন খারিজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে জয়ী বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পথ আটকাতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন আপিল বিভাগে যে আবেদন করেছিলেন, তা ধোপে টেকেনি।
সর্বোচ্চ আদালত বুধবার আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় সরোয়ার আলমগীরের এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা থাকল না বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
হাই কোর্ট সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করায় আপিল বিভাগে এই আবেদন করেছিলেন নুরুল আমিন। হাই কোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করারও আর্জি জানিয়েছিলেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ ওই আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আদেশ দেয়।
বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
আদালতে আবেদনকারী মুহাম্মদ নুরুল আমীনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
অন্যদিকে সরোয়ার আলমগীরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আহসানুল করিম ও এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াতের প্রার্থী একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়েছিলেন, যাতে সরোয়ার আলমগীর এমপি হিসেবে কাজ করতে না পারেন।
“কিন্তু এরই মধ্যে হাই কোর্ট বিভাগ পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করেছে। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে, সুতরাং অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়ে করা আবেদনটির প্রয়োজন থাকে না। তাই আদালত আজকে মামলাটি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন।”
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়টি পাওয়ার পর নুরুল আমীন চাইলে নিয়মিত আপিলের আবেদন করতে পারবেন।’
“কিন্তু বর্তমানে এই মামলাটির প্রেক্ষিতে বলতে পারি, সরোয়ার আলমগীর এমপি হিসেবে যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, শপথ নিয়েছেন বা পার্লামেন্টে যোগ দিয়েছেন—সেটি অব্যাহত থাকবে। তার দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা থাকল না।”
হাই কোর্টের রায়ের কার্যকারিতা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত হাই কোর্টের এই রায়টির বিরুদ্ধে কেউ আপিল না করছেন এবং সর্বোচ্চ আদালত যদি আপিল শুনে কোনো স্থগিতাদেশ না দেন, ততক্ষণ পর্যন্ত অবশ্যই হাই কোর্টের রায়টি কার্যকর।”
নুরুল আমীনের আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘‘হাই কোর্টের রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি হাত পেলেই তারা আপিলের আবেদন করবেন।’’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। কিন্তু এই বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপের অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমীন।
শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ওই আপিল মঞ্জুর করলে সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়।
ইসির ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সরোয়ার। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট ইসির সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেয়।
হাই কোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান জামায়াত মনোনীত প্রার্থী। ৩ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে আপিল বিভাগ তার লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে নির্দেশ দেয় যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সরোয়ার আলমগীর অংশ নিতে পারবেন, তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আসনের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না।
নির্বাচনে সরোয়ার আলমগীর ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নুরুল আমীন পান ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ইসি গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখায় সরোয়ারের শপথ আটকে থাকে।
এরপর ফল প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের অনুমতি চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন সরোয়ার। গত ১৬ জুন আপিল বিভাগ দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তি করতে মামলাটি ফের হাই কোর্টে পাঠিয়ে দেয়।
সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৯ জুলাই হাই কোর্ট রায় দেয়। রায়ে সরোয়ারের প্রার্থিতা বাতিলে ইসির সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
ওইদিনই সরোয়ারকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে ইসি সচিবালয় এবং সন্ধ্যায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
তবে রায় ঘোষণার দিন নুরুল আমীনের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছিলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পেলে তারা আপিল করবেন।
পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশের আগে গেজেট প্রকাশ ও শপথ আয়োজনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সেদিনই নির্বাচন কমিশনকে উকিল নোটিস পাঠিয়েছিলেন শিশির মনির। তিনি বলেছিলেন, “হাই কোর্টের রায়ের কোনো কপি বের হয়নি, রায় লেখা হয়নি এবং সইও হয়নি। কোর্টের কোনো কাগজপত্র নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়নি। হঠাৎ করে শুনলাম নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করতে যাচ্ছে।”
এই প্রেক্ষাপটেই হাই কোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত এবং সরোয়ারের সংসদ অধিবেশনে যোগদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে গত ১২ জুলাই আপিল বিভাগে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের এই আবেদন করেছিলেন মুহাম্মদ নুরুল আমীন।





