কলকাতায় মমতার ‘শহীদ দিবস’ মঞ্চে ভাঙচুর
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কলকাতায় ‘শহীদ দিবস’ পালন করছে জাতীয় কংগ্রেসের বিভক্ত চার দল ও বিদ্রোহীরা। মূল কংগ্রেস ও টুকরা হওয়া তিন দলই আজ পৃথকভাবে দিনটি পালন করছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস কলকাতার তারা মন্ডল বা বিড়লা প্লানেটরিয়ামের কাছে শহীদ দিবসের মঞ্চ তৈরি করেছে। গতকাল সোমবার মঞ্চ তৈরির সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামধারী একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মঞ্চের সামনের পোস্টার, ব্যানার, ফ্লেক্স ছিঁড়ে ফেলেন। কর্মীদের মরধর করার অভিযোগও উঠেছে।
মঞ্চে ভাঙচুর ও হামলার খবর পেয়ে তৃণমূল নেতা–কর্মীদের নিয়ে মমতা মঞ্চ নির্মাণস্থলে যান। সারা রাত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। আজ সেখানে দিবসের মূল অনুষ্ঠানে তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেসের অঙ্গসংগঠন যুব কংগ্রেসের নেতা–কর্মীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সচিবালয় মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিং অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। তাদের দাবি ছিল, সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র।
তখন মমতা ছিলেন যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি। তার নেতৃত্বেই সেদিন মহাকরণ বা রাইটার্স ভবন অভিযান হয়েছিল। অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে ১৩ যুব কংগ্রেস কর্মী নিহত হন।
সে সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বামফ্রন্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন মণীশ গুপ্ত আর কলকাতার পুলিশ কমিশনার তুষার কান্তি তালুকদার।
সেদিনের গুলি চালানোর দায় মমতার দল রাজ্য সরকারের ওপর বর্তালেও সরকারিভাবে তা স্বীকার করা হয়নি। দাবি ওঠে, সেদিনের স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের নির্দেশেই পুলিশ গুলি চালিয়েছিল।
পরে ২০১১ সালের ৪ নভেম্বর সাবেক বিচারপতি সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করা হলে কমিশন ৪৪ জনকে সাক্ষ্যের জন্য ডাকে। তাদের মধ্যে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, সোমেন মিত্র, প্রদীপ ভট্টাচার্য, মণীশ গুপ্ত, তুষার কান্তি তালুকদার প্রমুখ। তবে সেদিন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হয়নি।
তদন্ত কমিশন ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা তা প্রকাশ্যে আনেননি। সেই প্রতিবেদনই গতকাল রাজ্য বিধানসভায় পেশ করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
প্রতিবেদন পেশ করে শুভেন্দু মমতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ২১ জুলাইয়ের আবেগ ও শহীদের রক্ত ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাজনৈতিক আখের গুছিয়েছেন। কিন্তু শহীদ পরিবারগুলো আজও উপেক্ষিত।
সেদিন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলের নেতা পঙ্কজ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সাক্ষ্য না দিয়ে দাবি করেছিলেন, গুলি চালানোর জন্য দায়ী ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত। যদিও তৃণমূল নেত্রী পরে মণীশ গুপ্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করেন এবং রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী বানান। এমনকি পরে তাঁকে রাজ্যসভার সংসদ সদস্যও করা হয়। সেই মণীশ গুপ্ত এবার তৃণমূলের বিদ্রোহী দলে শামিল হয়েছেন।
১৯৯৩ সালের ওই ঘটনাকে স্মরণে রাখতে ১৯৯৮ সালে গঠিত তৃণমূল কংগ্রেস মূলত ২১ জুলাইকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে বড় পরিসরে পালন করে আসছে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিহত ১৩ জনের পরিবারকে মঞ্চে এনে ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে এ সমাবেশ আয়োজন করত দলটি। তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের চরম পরাজয় এবং দল ভেঙে তিন টুকরা হওয়ায় শহীদ দিবস পালনে বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
মমতার দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৭০ জন বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে নাম লিখিয়েছেন। অন্যদিকে, লোকসভার ২৮ সদস্যের মধ্যে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ সদস্য নতুন আঞ্চলিক দল ‘এনসিপিআই’ (ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি)-তে যোগ দিয়েছেন। এনসিপিআইয়ের নেতারা মনে করছেন, আজকের অধিবেশনেই লোকসভার স্পিকার তাদের এ দলকে স্বীকৃতি দিয়ে আলাদাভাবে বসার অনুমতি দেবেন।
ফলে এবার শহীদ দিবস পালন হচ্ছে চারটি দলের ব্যানারে। কালীঘাটের তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস দিনটি পালন করবে কলকাতার মেয়ো রোডের গান্ধী মূর্তির পাদদেশে আর জাতীয় কংগ্রেস কলকাতার ধর্মতলার শহীদ মিনার পাদদেশের ময়দানে।




