শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ, দীর্ঘ হচ্ছে সংকট
দেশে প্রতিবছর গ্যাসের গড় উৎপাদন দিনে কমছে ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করেও ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত হলেই গ্যাসের সংকট বেড়ে যাচ্ছে। গ্যাসের অভাবে নিয়মিত ভুগছে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন। এর মধ্যেই বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। তাই শিল্পে নতুন সংযোগ আপাতত দেবে না সরকার।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে ১৪ জুলাই একটি চিঠি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে দুটি এফএসআরইউভিত্তিক এলএনজি আমদানি সীমাবদ্ধ থাকায় এ মুহূর্তে শিল্পে নতুন করে গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে না।
এফএসআরইউ হলো ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট। আমদানি করা এলএনজি মজুত করে রূপান্তরের মাধ্যমে গ্যাসের পাইপলাইনে সরবরাহ করে এটি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে ভাসমান এমন দুটি টার্মিনাল আছে। এ দুটি মিলে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এখন সরবরাহ হচ্ছে ৫০ কোটি ঘনফুটের কম। এতে এক সপ্তাহ ধরে দেশের সব খাতেই গ্যাসের সংকট বেড়ে গেছে।
তবে শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংযোগ না দেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। গ্যাস–সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে জরুরি ভিত্তিতে সংযোগ দেওয়া ও বরাদ্দ (লোড) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি কিছু কারখানায় গ্যাস-সংযোগ দেয়। তবে কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে ওই কমিটি বাতিল করে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কিছু গ্যাস-সংযোগ দেয় তৎকালীন সরকার।
এদিকে অনুমোদিত গ্যাস–সংযোগের আবেদন থেকে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে একটি কমিটি গঠন করে গত অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করা তালিকা থেকে তিতাস গ্যাসের ২৫টি সংযোগ অনুমোদন করে জ্বালানি বিভাগ। এরপর ওই কমিটিও বাতিল করা হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৭ মে সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে এক বৈঠক হয়। সেখানে শিল্পে গ্যাসের সংযোগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, প্রতি সপ্তাহে বা প্রতিদিন কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। নতুন কূপ খনন করেও উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। এক দশকের ব্যবধানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। ২০১৭ সালে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে। এর পর থেকেই এটি কমতে শুরু করে। ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। এখন আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলে দিনে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা যায়। অবকাঠামো না থাকায় আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। চাইলেও সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। তাই বিকল্প উপায় খুঁজছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘শিল্পে সংযোগ না দেওয়ার বিষয়টি সাময়িক। দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে সরকার। ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার একাধিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের (এলএনজি পরিবহনের বিশেষ কনটেইনার) মাধ্যমে এলএনজি আনার আলোচনা চলছে। গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির পর অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে সংযোগ দেওয়া হবে। যাঁরা অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই আগে বিবেচনায় থাকবেন।’’
জ্বালানি বিভাগের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। সার কারখানা বছরের অধিকাংশ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখে। এর মধ্যে নতুন করে সংযোগ দিলেও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। এক জায়গায় গ্যাস দিলে আরেক জায়গায় বন্ধ করে দিতে হবে। এটি তো সমাধান নয়। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। তবে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে অন্তত এক বছর লাগতে পারে। এরপর শিল্পে সংযোগ দিতে চায় সরকার।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘‘এক বছরে সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও উৎপাদনে কয়েক বছর লাগতে পারে। আর আমদানি বাড়াতে অবকাঠামো তৈরি করতে অন্তত দেড় বছর লাগতে পারে।
মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আনা নিয়ে গতকালই দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আইএসও ট্যাংকের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে এক বছর লাগবে। এরপর ওরা দিনে সরবরাহ করতে পারবে মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। যা দিয়ে একটি বড় শিল্পকারখানার চাহিদাও মেটানো যাবে না। খুবই ছোট পরিসরের সরবরাহ পদ্ধতি এটি। এতে এলএনজির খরচও বেশি পড়বে। তাই এটি কার্যকর করা কঠিন। টার্মিনাল নির্মাণ করেই আমদানি বাড়াতে হবে।’’
বিদ্যমান দুটির পাশাপাশি আরও দুটি ভাসমান এবং স্থলভাগে একটি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে চুক্তি হয় সামিটের সঙ্গে এবং আরেকটির জন্য টার্ম শিট সই করা হয় মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের সঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে সামিটের চুক্তিটি বাতিল করে দেয়। এক্সিলারেটের সঙ্গে চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে গত দেড় বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল যুক্ত হয়নি।
তবে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেও আমদানি থেকে সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি জিটিসিএল বলছে, মহেশখালী থেকে এলএনজি আনার জন্য দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন আছে। পাইপলাইন দুটি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। এ দুটি পাইপলাইন দিয়ে ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। কিন্তু আনোয়ারা স্টেশন থেকে পরবর্তী পাইপলাইন দুটি সরু, অর্থাৎ ব্যাস কম। এ দুটিতে ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাবে না। আর গ্যাসের ব্যবহার মূলত আনোয়ারার পর থেকেই শুরু হয়। তাই সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দেশে গ্যাসের ১১ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। সবচেয়ে বেশি—৪১ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ খাতে। শিল্পে যায় ৩৬ শতাংশ। সারে ৬ শতাংশ, সিএনজি খাতে ৫ শতাংশ ও চা খাতে ১ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হয়। চাহিদা বুঝে বিদ্যুৎ থেকে কমিয়ে সারে, সার থেকে কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়ানো হয়। আবার সিএনজি স্টেশন বন্ধ করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই টানাটানি করে চলছে দেশের গ্যাস খাত। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, প্রতিশ্রুত সংযোগগুলো দেওয়া হলে আরও ৩৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাসের প্রয়োজন হবে। এটি আপাতত সংস্থানের কোনো উপায় নেই।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধানের তুলনায় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে সফলতার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি বাংলাদেশে। তবু যথাযথ অনুসন্ধান করা হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের ১৪ বছর পরও বঙ্গোপসাগরে তেল–গ্যাস আবিষ্কার কার যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চারটি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও শেষ না করে চলে গেছে। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানও জোর ছিল না। এরপর গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলতে পারে। আমদানিনির্ভরতায় ঝুঁকি থাকবেই। জ্বালানির অভাবে অর্থনীতি এগোচ্ছে না, আর অর্থনীতি এগোচ্ছে না বলে জ্বালানি আমদানির ডলার জমা হচ্ছে না। একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছে দেশ।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, দীর্ঘদিনের জমানো সংকট রাতারাতি বদলানো যাবে না। সরকার একাধিক উপায়ে এটি সমাধানের চেষ্টা করছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। স্থলভাগেও গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম চলমান আছে। তবে জ্বালানি অনুসন্ধান, কূপ খনন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। নতুন করে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানির উৎস ও সরবরাহ অবকাঠামো বহুমুখী করা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘সরবরাহ বাড়িয়ে নতুন সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে। কিন্তু যারা অনুমোদনের পর ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে ও ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে, তাদের সংযোগ না দিলে তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। দ্রুততম সময়ে সরবরাহ বাড়িয়ে হলেও সংযোগ দিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ বাড়াতে আমদানির কোনো বিকল্প নেই। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করা ঠিক হয়নি। এখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর অবকাঠামো বানাতে হবে। আপাতত কোনো মুক্তি নেই।’’





