রাষ্ট্রপতির আলোচনায় মির্জা ফখরুল, কী বলছেন বিশ্লেষকরা
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং বিভিন্ন মহলে গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সংকটময় সময়ে ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্বের কারণে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদের জন্য শক্তিশালী বিবেচনায় রয়েছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি নতুন সরকার গঠন করলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইবে এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে, যিনি রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে শক্ত হাতে হাল ধরতে পারবেন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। মির্জা ফখরুল যেহেতু নিজে এবার নির্বাচন করে রাজনীতি থেকে অবসরের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন (সাম্প্রতিক কিছু জনসভায়), তাই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করাটা হবে তার দীর্ঘ ত্যাগের একটি যথাযোগ্য সম্মান। কেননা, মির্জা ফখরুল শুধু বিএনপি মহাসচিব নন, তিনি বর্তমান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার মতো একজন মানুষকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম কালবেলাকে বলেন, অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সেই বিবেচনায় বিএনপির উচিত হবে এমন লোককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা, যিনি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য এবং আনুগত্যশীল ও প্রাজ্ঞ।
ড. আলম আরও বলেন, জিয়া পরিবারের প্রতি তো বটেই, দলের প্রতি অবশ্যই আনুগত্যশীল থাকতে হবে। এটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিজেই বাছাই করতে হবে। অন্যদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। যেহেতু তারেক রহমান দীর্ঘ ১৬ বছর নেতাদের দেখছেন; কার কী অবদান—সবই তিনি জানেন। সুতরাং তাকেই এসবের মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি হতে হবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সবার কাছে শ্রদ্ধাভাজন। সেইসঙ্গে সৎ, দক্ষ এবং সাহসী হতে হবে। কারণ যাদের আগে দেওয়া হয়েছিল তারা কিন্তু শুধু পদ অনুযায়ী চেয়ারেই বসেছিলেন। তারা দলের দুঃসময়ে কোনো সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারেননি। বিশেষ করে ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের সময় দেখা গেছে তিনি অনেক কিছুই করতে পারতেন; কিন্তু সেটা তিনি পারেননি।
এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, এখন রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যাপার আছে। সেই বিষয়গুলো তো মাথায় রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা কালবেলাকে বলেন, বিএনপিতে যোগ্য বেশ কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতা আছেন, যারা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য। তবে শারীরিক সক্ষমতা ও সংকটকালে প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—এমন কাউকেই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য মনে করি। এক্ষেত্রে বিএনপি মহাসচিব যোগ্যতম। রাজনীতিবিদকেই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করা উচিত হবে বলেও আমি মনে করি।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে এমন এক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত, যিনি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের অধিকারী নন; তিনি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হবেন। রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। সংবিধান, আইন, বিচার ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ পদটি দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের আসন। তাই এখানে একজন প্রাজ্ঞ, সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। তিনি দলীয় দায়িত্ব পালন করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন—এমন হতে হবে। সর্বোপরি, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ থাকা উচিত নয়। এমন পরীক্ষিত নেতৃত্বই রাষ্ট্রপতি হিসেবে যোগ্য। রাষ্ট্রের মর্যাদা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অভিজ্ঞ ও নৈতিক নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।




