কোন কৌশলে ব্রাজিলকে আটকাবে, কঠিন ‘ছক’ জাপানের
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল ব্রাজিল। দুর্দান্ত খেলেই টুর্নামেন্টের নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে সেলেসাওরা। এদিকে, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বিশ্বকাপের পরের রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছে সূর্যদয়ের দেশ জাপানও। এবার এশিয়ার জায়ান্টদের সামনে প্রতিপক্ষ ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এরইমধ্যে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন জাপানের কোচ হাজেমি মোরিয়াসু। ঠিক কোন জায়গায় এবারের বিশ্বকাপে জাপান সবার থেকে আলাদা?
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জাপান ডাগআউটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রটি কোনো ট্যাবলেট, ল্যাপটপ কিংবা প্রযুক্তির আধুনিক যন্ত্র নয়। সেটি একটি সাধারণ সাদা হোয়াইটবোর্ড আর একটি কালো মার্কার।
হাফটাইমের বাঁশি বাজতেই খেলোয়াড়দের ভিড় জমে সেই বোর্ডের চারপাশে। কয়েকটি সরল রেখা, কিছু তীরচিহ্ন, ছোট ছোট বৃত্ত। দেখতে সাধারণ, কিন্তু সেই আঁকাতেই লুকিয়ে থাকে পরের ৪৫ মিনিটের যুদ্ধ পরিকল্পনা। জাপান কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর বিশ্বাস, দীর্ঘ অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতার চেয়ে একটি পরিষ্কার চিত্র অনেক দ্রুত খেলোয়াড়দের মাথায় পৌঁছে যায়।
এবার সেই হোয়াইটবোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, ম্যাথেউস কুনিয়ার তীক্ষ্ণ আক্রমণ আর নেইমারের সৃজনশীলতা থামানোর নতুন ছক এখন নিশ্চয়ই আঁকা হচ্ছে মোরিয়াসুর মার্কারের আঁচড়ে। ফুটবল বিশ্বের চোখও তাই এখন সেই সাদা বোর্ডের দিকেই।
জাপানের ফুটবল দর্শন অন্যদের থেকে আলাদা। তারা অযথা বলের দখল ধরে রাখতে চায় না। বরং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়াই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
দাইচি কামাদা, ওয়াতারু এন্দো কিংবা কেইতো নাকামুরারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগোনোর চেয়ে দ্রুত ওয়ান টাচ পাস আর নিখুঁত টাইমিংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক তৈরি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর সামনে ফেনুর্ডের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার বুদ্ধিদীপ্ত অফ দ্য বল রান ডিফেন্ডারদের অবস্থান ভেঙে দিয়ে তৈরি করছে গোলের সুযোগ।
মোরিয়াসুর হোয়াইটবোর্ড কৌশলের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর:
প্রথমটি হলো রিয়েল টাইম অ্যাডজাস্টমেন্ট। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের রক্ষণ কোথায় দুর্বল হচ্ছে, কোন জায়গায় বেশি স্পেস তৈরি হচ্ছে, হাফটাইমেই সেগুলো চিহ্নিত করে দেন তিনি।
দ্বিতীয়টি জোনভিত্তিক নির্দেশনা। কোন দিক দিয়ে আক্রমণ গড়তে হবে, কখন ফুলব্যাকের পেছনের ফাঁকা জায়গায় বল ফেলতে হবে, কিংবা কখন খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলাতে হবে, সবকিছুই বোঝানো হয় সহজ কিছু রেখাচিত্রের মাধ্যমে।
তৃতীয়টি মানসিক স্বচ্ছতা। জটিল ট্যাকটিক্যাল ব্যাখ্যার বদলে সহজ ভিজ্যুয়াল নির্দেশনা খেলোয়াড়দের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফলে মাঠে বিভ্রান্তি কমে, বাড়ে আত্মবিশ্বাস।
শুধু পরিকল্পনাই নয়, ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলালে মুহূর্তেই নিজের কৌশলও বদলে ফেলেন মোরিয়াসু। এই বিশ্বকাপে জাপান বেশিরভাগ সময় ৩-৪-২-১ ফর্মেশনে খেললেও বলের নিয়ন্ত্রণ পেলে সেটি খুব দ্রুত ৩-৪-৩ রূপ নেয়। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই বদলে যায় পুরো আক্রমণ কাঠামো। এক পাশ দিয়ে একাধিক খেলোয়াড়কে নিয়ে প্রতিপক্ষকে টেনে আনে জাপান। এরপর হঠাৎ করেই খেলা ঘুরে যায় বিপরীত উইংয়ে। সেই মুহূর্তেই তৈরি হয় নতুন আক্রমণের রাস্তা। দ্রুত ট্রানজিশন, নিখুঁত ওয়ান টাচ পাসিং এবং অসাধারণ অফ দ্য বল মুভমেন্টই এখন সামুরাই ব্লুদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কাগজে কলমে ব্রাজিলই হয়তো এগিয়ে। ইতিহাস, তারকা আর অভিজ্ঞতায়ও সেলেসাওদের পাল্লা ভারী। কিন্তু আধুনিক ফুটবল বারবার দেখিয়েছে, শুধু বড় নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। সঠিক পরিকল্পনা, নিখুঁত বাস্তবায়ন আর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল দিয়ে যেকোনো পরাশক্তিকেই চাপে ফেলা সম্ভব।
এখন দেখার অপেক্ষা, হাজিমে মোরিয়াসুর সেই সাদা হোয়াইটবোর্ডে আঁকা নতুন ছক কি আরেকটি বিশ্বকাপ বিস্ময়ের জন্ম দেয়, নাকি ব্রাজিলের তারকাখচিত আক্রমণের সামনে থেমে যায় সামুরাই ব্লুদের স্বপ্ন।




