রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরিতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা যদি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না রাখতে পারি, তাহলে কোনো কিছুই তৈরি করতে পারব না। তৈরি হবে, ভেঙে যাবে। সে জন্য একটা স্থিতিশীল পরিবেশ দরকার।
“এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি আপনাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর একটা বড় ভূমিকা আছে। যেই ভূমিকাটা আপনারা সোশ্যাল মিডিয়া হোক, যে কোনো মাধ্যমে, ধীরে ধীরে একটা ওপিনিয়ন তৈরি করতে হবে। …রাজনীতিকে সংসদে যেতে হবে। শুধু রাজপথে এসে হইচই করলেই কোনো কিছু গড়ে তোলা যায় না।”
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে যান।
সেখানে সরকারপ্রধান দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির প্রথম পর্বের ছাত্রী কাবেরী আজাদ প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, আর্টিস্টদের শিল্প বাজারের প্রসারে সরকারের কোনো পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা আছে কিনা।
কাবেরী বলেন, “আমোদের ফাইন আর্টস ফ্যাকাল্টিতে ৮টা ডিপার্টমেন্ট আছে, কিন্তু মিউজিওলজি বা কনজারভেশন, আর্টওয়ার্ক রেস্টোরেশন–এগুলো নিয়ে বা নিউ মিডিয়া আর্ট নিয়ে কোনো ডিপার্টমেন্ট নেই। আমাদের জাদুঘরে বিশেষজ্ঞদের আমরা বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। যদি ডিপার্টমেন্ট থাকত, আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলোতে তখন আমরা একটা বেশ বড় সংখ্যায় প্রশিক্ষিত লোকজন পেতাম; যারা এখানে কাজ করতে পারেন।”
জবাবে তারেক রহমান বলেন, “ডিপার্টমেন্ট আরো ওপেন হবে না–এটা আমি সঠিক বলতে পারব না। এটা ভিসি সাহেব বলতে পারবেন। এই যে আপনারা অনেক কিছু চাইছেন, মনে করছেন হওয়া উচিত দেশে। এসব কিছু যদি আমাদের আস্তে আস্তে করতে হয়, দেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ লাগবে। আমরা যদি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না রাখতে পারি, তাহলে কোনো কিছুই তৈরি করতে পারব না।
“কোনো কিছু গড়ে তোলার জন্য স্থিতিশীলতা লাগে, আলোচনা করতে হয়। কোনো কিছু গড়ে তোলার জন্য বসে চিন্তা করে কাজে হাত দিতে হয়। কাজেই এই সহযোগিতা আপনাদের লাগবে। আপনাদের এখানে শক্ত হতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে।”
দেশের জাদুঘরগুলোর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমাদের অনেকগুলা জাদুঘর আছে। আমি আগে গিয়েছি, এবার আসার পর (লন্ডন থেকে ফিরে) সুযোগ হয়নি। আমার কাছে অনেক সময় বেশ খারাপ লেগেছে, মনে হয় যে এতিমের মত পড়ে আছে।
“আমাদের অনেক কিউরেটর দরকার। এর মধ্যে একটা উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে একটার কাজ শুরু করেছেন শিক্ষামন্ত্রী, অন্যটা বোধহয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এর মধ্যে মন্ত্রী এবং সচিবের সঙ্গে আমি বসেছি; উনারা কাজ শুরু করবেন।”
সরকারের একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা স্কুলের বাচ্চাদের সংসদে নিয়ে যাচ্ছি, তারা দেখবে। এটা আমি এই জন্য বলছি, আমার অভিজ্ঞতা ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেখার। ওদের ওখানে গাইডেড ট্যুর সিস্টেম আছে। আপনি টিকিট কেটে যেতে পারেন, পুরো পার্লামেন্ট দেখাবে, ওটার ইতিহাস বলবে, ঐতিহ্য বলবে।
“ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিল এবং যেদিন আমি দেখেছিলাম, সেদিন চিন্তা করেছিলাম, যদি ইনশাল্লাহ কোনোদিন সুযোগ হয়, তাহলে আমি এই ব্যবস্থাটা আমার দেশের বাচ্চাদের জন্য করার চেষ্টা করব।”
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ৩৫ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা বলেন। তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে প্রায় ৩৫ বছর আগে ফিরে গেছি। ইউজিসির প্রোগ্রামটা শেষ করার পরে আমাকে ওখানে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি গাড়িতে যাব না হেঁটে।
“এত বছর পরে সেই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে আমার খুব ইচ্ছা ছিল হেঁটে একটু দেখতে দেখতে আসব। কিন্তু সে সৌভাগ্য হয়নি। বুঝতেই পারছেন কেন। ইনশাল্লাহ আরেকবার আসতে হবে।”
ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মোবাশেরুজ্জামান হাসান প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে যে অনিয়মগুলো আছে, সেগুলো নিরসনে সরকারের পরিকল্পনা কী?
জবাবে তারেক রহমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্নীতি, বালিশ কাণ্ড, বিভিন্নভাবে অর্থপাচার প্রভৃতি ঘটনাগুলো তুলে ধরে বলেন, “প্রতিবছর যদি ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার ধরেন, তাহলে ১০ বছরে কত বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে? অনেকে বলেন, দুর্নীতির জিরো টলারেন্সের কথা। আমার কাছে কথাটা অবাস্তব মনে হয়।
“বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা যতই বলি জিরো টলারেন্স, এটা একটা অবাস্তব ব্যাপার। কিন্তু আমরা যেটা চেষ্টা করছি, এই বিষয়টাকে যতটুকু লাগাম টেনে ধরা যায়। এত বছরের বিষয়টা আমরা দুই মাস, ছয় মাস, এক বছর, দুই বছরে পারব না। এটা একটা অভ্যাসের ব্যাপার।”
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতির প্রভাব নিয়েও কথা বলেন। সরকারপ্রধান বলেন, “দুঃখজনক হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা যা বুঝি, ইন্টারন্যাশনালি রেটিংয়ের মধ্যে পড়ছে না। এর মূল কারণ, এখানে যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হওয়া উচিত ছিল, খুব সম্ভবত অতীতে সেভাবে হয়নি। দূর থেকে এটা আমরা শুনেছি, পত্র-পত্রিকায় পড়েছি। এখানে রাজনৈতিক পক্ষপাত বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
“আমরা যদি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রেজাল্ট দেখে, মেরিট দেখে নিয়োগ দিই, আমি মনে করি এই অবস্থাটা পরিবর্তন করা সম্ভব। এর বাইরেও শিক্ষকদের বেলায় ডিন বা উচ্চ পদের জন্য পাবলিকেশন দরকার হয়, সেগুলোর অনুপস্থিতি দেখছি। আমরা যদি এই বিষয়গুলো অনুসরণ করি… আমি উপাচার্য সাহেবকে অনুরোধ করব যে, এই বিষয়গুলো সামনে দেখি।”
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার চর্চা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।





