হরমুজে আটকা ২ হাজার জাহাজ, প্রাণভয়ে ২০ হাজার নাবিক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানের ক্রমাগত হুমকি আর হরমুজ প্রণালি অবরোধে আটকা পড়েছে ২,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজ। এই জাহাজগুলোতে থাকা ২০,০০০ নাবিকের জীবন এখন চরম সংকটে।
ফুরিয়ে আসছে খাবার ও পানি। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয় তাদেরকে গ্রাস করছে। এক দিকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলার ভয়, অন্যদিকে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কমে আসতে থাকায় দিশেহারা এই নাবিকরা এখন বাঁচার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নাবিক সহায়তা সংস্থা ও হেল্পলাইনগুলো জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে তারা এই অঞ্চলে আটকে থাকা জাহাজের নাবিকদের কাছ থেকে হাজার হাজার সাহায্য প্রার্থনার বার্তা পেয়েছে।
অধিকাংশ নাবিকই জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফেরাসহ বকেয়া বেতন এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের (আইটিএফ) কাছে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, “নাবিকদের বাঁচিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে খাবার, পানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস প্রয়োজন।”
আরব বিশ্ব ও ইরানের আইটিএফ নেটওয়ার্কে সমন্বয়ক মোহাম্মদ আরাচেদি জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
তিনি বলেন, “নাবিকরা গভীর রাতে যখনই ইন্টারনেট পান, তখনই ফোন করেন। একজন নাবিক আতঙ্কে চিৎকার করে বলছিলেন, “এখানে বোমা পড়ছে, আমরা মরতে চাই না। দয়া করে আমাদের বাঁচান’।”
কেন ফিরতে পারছেন না নাবিকরা?
সংঘাত শুরুর পর ‘ইন্টারন্যাশনাল বারগেইনিং ফোরাম’ হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকাকে ‘যুদ্ধাঞ্চল’ ঘোষণা করেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, যুদ্ধাঞ্চলে থাকা নাবিকরা কোম্পানির খরচে দেশে ফেরা এবং দ্বিগুণ বেতন পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু অনেক নাবিকই জাহাজে আছেন এমন কোনও চুক্তি ছাড়াই।
গত ১৮ মার্চের একটি ইমেইলে এক নাবিক অভিযোগ করেন, জাহাজ পরিচালনাকারীরা তাদের দেশে ফেরার অনুরোধ উপেক্ষা করছে।
তিনি লেখেন, “নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকার পরও আমাদের জোর করে কার্গো অপারেশন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমাদের জন্য কোনও বিকল্প পথ খোলা রাখা হয়নি।”
আইটিএফ-এর সাপোর্ট টিমের সদস্য লুসিয়ান ক্রাসিউন জানান, প্রাপ্ত ইমেইলগুলোর প্রায় ৫০ শতাংশই বেতন সংক্রান্ত। অনেক নাবিক জীবনের ঝুঁকি নিয়েও জাহাজে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, তাদের ফিরে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই।
একজন নাবিক নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে যুদ্ধাঞ্চলে থাকায় তার দৈনিক ১৬ ডলার বেতন ৩২ ডলার হবে কি না।
আইটিএফ-এর মতে, এত কম বেতন প্রমাণ করে যে, জাহাজ মালিকদের সঙ্গে নাবিকদের কোনও সুষ্ঠু শ্রম চুক্তি নেই, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তাদের আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে।
শিপিং বাণিজ্যের গোলকধাঁধা:
‘উইয়ার্ড’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক শিপিং ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। একটি জাহাজের মালিক এক দেশের, নিবন্ধন অন্য দেশের, ব্যবস্থাপনা তৃতীয় কোনও পক্ষের এবং জাহাজটি অবস্থান করে অন্য কোনো জলসীমায়।
স্বাভাবিক সময়ে এটি বাণিজ্যে সুবিধা দিলেও সংকটের সময় নাবিকদের দায়িত্ব কে নেবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সব পক্ষ একযোগে কাজ না করলে নাবিকদের উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
১০ নাবিকের মৃত্যু:
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৯টি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে ১০ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরান হুমকি দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো হবে।
বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের এই রুটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারত ও চীনের মতো এশীয় দেশগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই অবরোধ বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।




