মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করা ইরানের ২ তেলের ট্যাংকারের ইউ-টার্ন
ইরান ত্যাগের চেষ্টা করা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারকে জোরপূর্বক থামানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের এক যুদ্ধজাহাজ তাদেরকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া অবরোধ কার্যকর হওয়ার একদিন পর মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) এ ঘটনা ঘটে।
নৌযান দুটি ওমান উপসাগরে অবস্থিত চাবাহার বন্দর থেকে রওনা দিয়েছিল, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ তাদের সঙ্গে বেতার বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা ওই কর্মকর্তা।
ট্যাংকার দুটিকে আর কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ট্রাম্পের অবরোধের লক্ষ্য হচ্ছে ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে তার অবসান ঘটানো। সঙ্কীর্ণ এ প্রণালিটি দিয়েই বিশ্বের তেল-গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ বা ২০% গন্তব্যে যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের আশা, তার অবরোধের চাপে ইরান বাধ্য হয়ে হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের শর্তেই যুদ্ধ বন্ধে রাজি হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। সাড়ে ৫ সপ্তাহে কয়েক হাজার লোকের প্রাণহানির পর যুদ্ধ দুই সপ্তাহের এক ভঙ্গুর বিরতিতে রয়েছে। এ যুদ্ধবিরতি আগামী সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা।
তবে এই অবরোধ ট্রাম্পের আশা পূরণে কতখানি সহায়ক হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসিরি নোম রেইডেন বলছেন, অবরোধ শুরু হওয়ার পর কেবল একটি ট্যাংকার ইউ-টার্ন নিয়েছে বলে নৌচলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্য বলছে। তবে ইরানি তেল সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ নৌযান সম্ভবত তাদের ট্র্যাকিং সঙ্কেত বন্ধ করে রেখেছে।
“এই অবরোধ কতখানি কার্যকর হবে, আমরা এখনই তা বলতে পারছি না। মাত্র দ্বিতীয় দিন চলছে,” বলেছেন রেইডেন।
মঙ্গলবার আগের দিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছিল, ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের নির্দেশ মেনে ঘুরে ওমান উসাগরের ইরানি বন্দরে ফিরে যায়। ওই ছয়টি জাহাজের মধ্যে এ দুটি ট্যাংকারও আছে বলে জানিয়েছেন ওই মার্কিন কর্মকর্তা।
সোমবার ওয়াশিংটন সময় সকাল ১০টায় কার্যকর হওয়ার পর থেকে কোনো নৌযানই এ অবরোধ ভাঙতে পারেনি, বলেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানায়, সোমবার থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনী ৮টি নৌযানকে ইরানের বন্দরগুলোতে যেতে বা সেখান থেকে বের হতে দেয়নি।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই মার্কিন বাহিনী নৌযানগুলোর ক্রু’দের সঙ্গে বেতার বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করে এবং তাদেরকে ফিরে যেতে বলে, জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তারা বলেন, সব ট্যাংকারই নির্দেশ মেনেছে, যে কারণে কোনে নৌযানে সেনা পাঠানো লাগেনি।
১০ হাজারের বেশি সেনা
যুক্তরাষ্ট্রের এ নৌ অবরোধে ১০ হাজারের বেশি সেনা, ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ ও কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
যেসব নৌযান ইরানে ঢুকবে না বা দেশটি থেকে বের হবে না, সেগুলো হরমুজ প্রণালি অবাধে পার হতে চাইলে তাদেরকে সহায়তা করা হবে বলেও জানিয়েছে তারা।
দিনকয়েক আগে পাকিস্তানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প এ অবরোধের ঘোষণা দেন। তার ওই ঘোষণার পর ফের তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে নতুন করে ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার সম্ভাবনা দেখা যাওয়ায় মঙ্গলবার দাম খানিকটা কমেছে।
শনিবার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ছিলেন। গত ৪৯ বছরে ইরানের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পর্যায়ের বৈঠকে এত উচ্চ-পদস্থ কেউ ছিলেন না।
ট্রাম্পের কৌশল যদি শেষ পর্যন্ত কাজে দেয় তাহলে তিনি শান্তি আলোচনায় ইরানের সবচেয়ে বড় ‘হাতিয়ারকে’ অকার্যকর করে দিতে পারবেন। তেহরানকে ওয়াশিংটনের শর্তে রাজি করাতে অনেকদূর এগিয়ে যাবেন।
হরমুজে থাকা ইরানি মাইন পরিষ্কার করতে পারলে ট্রাম্প বিশ্ব বাণিজ্যকে যেমন পথে ফেরাতে পারবেন, তেমনি তেলের দামও এখনকার তুলনায় অনেক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কিন্তু এ ধরনের নৌ অবরোধ আদতে নতুন যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল এবং অনির্দিষ্টকালের এ পদক্ষেপ কার্যকরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজও লাগবে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ পার হওয়ায় তেলের দাম এমনিতেই যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অন্তত ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
রোববার ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তেল ও পেট্রলের দাম এখনকার মতো বেশিই থাকতে পারে। তেমন কিছু হলে ওই মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ইরান যুদ্ধ এমনিতেও দেশটিতে ব্যাপক অজনপ্রিয়, বলছে একাধিক জরিপ।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর লাগাতার হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব এবং লুকিয়ে রাখা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে তেহরান ওয়াশিংটনের জন্য আরও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান কি চুপচাপ বসে থাকবে? অনেকের আশঙ্কা, অবরোধ সফলভাবে কার্যকর করতে পারলে এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরে থাকা নৌযান কিংবা মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া উপসাগরের দেশগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে।
“আমরা এখনো অবরোধের ‘পরীক্ষামূলক’ পর্যায়ে রয়েছি,” বলেছেন রেইডেন।





