গভর্নর পদের ৬৭ বছরের বয়সসীমা তুলে দিয়ে সংসদে বিল পাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে ৬৭ বছরের বয়সসীমা তুলে দিয়ে একটি বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকালে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধনের বিলটি উত্থাপন করেন। পরে দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী না থাকায় তা উত্থাপিত আকারে পাস হয়।
নতুন আইনের নাম রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন আইন, ২০২৬।
বিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের চার বছরের মেয়াদ ও পুনর্নিয়োগের সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে, তবে ৬৭ বছর পূর্ণ হলে পদে থাকা যাবে না বলে যে শর্ত ছিল, সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ এর ১০ অনুচ্ছেদের ৫ দফায় থাকা শর্ত বিলুপ্ত হবে। এর অর্থ, গভর্নর পদে চার বছরের মেয়াদ এবং পুনর্নিয়োগের বিধান থাকবে, কিন্তু বয়স ৬৭ বছর পার হলে পদ ছাড়তে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না।
বিলটির সঙ্গে দেওয়া ‘উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতি’তে বলেছেন, মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, ব্যাংক তদারকি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়সহ আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গভর্নর পদে ‘অভিজ্ঞ, দক্ষ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তি’ নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যমান বয়সসীমা অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৈরি সংশোধনের যৌক্তিকতা সংবলিত তুলনামূলক বিবরণীতেও একই কথা বলা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়, এ পদে বয়সসীমা ৬৭ বছর নির্ধারিত থাকায় আর্থিক খাতে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
ওই বিবরণীতে বলা হয়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও পাকিস্তান ছাড়া অন্য অনেক দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। সেই কারণেই “উক্ত আইনগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ” জনস্বার্থে প্রয়োজন বলে মত দেওয়া হয়েছে।
সংসদের চলতি অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে, তার অংশ হিসেবেই এই সংশোধনী বিলটি আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন বিলের পাশাপাশি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি বিলও ওই অধিবেশনে নিষ্পত্তি হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ গভর্নরের বয়সসীমা
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেশের মুদ্রানীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, ব্যাংক তদারকি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।
সে কারণে এ পদে নিয়োগের যোগ্যতা, মেয়াদ, পুনর্নিয়োগ এবং বয়সসীমা নিয়ে আইনি বিধান সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
সরকারের যুক্তি হল, আর্থিক খাতে অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে গেলে বয়সের নির্দিষ্ট সীমা অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে জটিল ব্যাংকিং ও আর্থিক বাস্তবতায় অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে এনে তারা এই সংশোধনী প্রস্তাব এনেছে।
আগেও একবার বাড়ানো হয়েছিল বয়সসীমা
এই পদের বয়সসীমা নিয়ে এটি প্রথম পরিবর্তন নয়। ২০২০ সালে আইন সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়েছিল। তখন সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরকে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বে রাখতেই সেই পরিবর্তন আনা হয়।
পরে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর করার উদ্যোগ নিলে আবারও বয়সসীমার বিষয়টি সামনে আসে। সে সময় সরকারের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, বিদ্যমান আইনে ৬৭ বছরের বেশি বয়সী কাউকে গভর্নর পদে রাখার সুযোগ নেই। প্রায় ৭৩ বছর বয়সী আহসান এইচ মনসুরকে দায়িত্ব দিতে তাই আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার সংসদে পাস হওয়া সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদের বয়সের ঊর্ধ্বসীমা পুরোপুরি তুলে দেওয়া হল।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী গভর্নরের মেয়াদ চার বছর। পুনর্নিয়োগের সুযোগ আছে। এ অবস্থায় বয়সসীমা তুলে দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে সরকার এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের বদলে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবে।




