রাজধানীতে অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ ৪ উগ্রবাদী গ্রেপ্তার
রাজধানী ও পাশের কেরাণীগঞ্জ এলাকা থেকে বিস্ফোরক, আগ্নেয়াস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ চার ‘উগ্রবাদীকে’ গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ডিবি রমনা বিভাগের একটি দল তাদের গ্রেপ্তার করে।
এই চার ব্যক্তি হলেন- ইমরান চৌধুরী (২৯), মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) এবং আবু বক্কর (২৫)। তারা সবাই বাংলাদেশি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন এরা ‘আরসা’ সদস্য।
পরে অভিযানে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা বলেন, “এদের সঙ্গে তেহরিক ই তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।”
রাতে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এদের ‘উগ্রবাদী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে এদের কোনো সাংগঠনিক পরিচয় দেওয়া হয়নি।
গত বছরের মার্চে ময়মনসিংহ থেকে আরসার প্রধান আতাউল্লাহ জুনুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই থেকে কারাগারে রয়েছেন জুনুনি।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, “চার আরসা সদস্যের কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, দুটি খেলনা আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি, দেড় কেজির বেশি বিস্ফোরক, তাদের জ্যাকেট, জিহাদী বইসহ আরও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।“
উগ্রবাদীরা আসলেই মাথাচাড়া দিচ্ছে কি না, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মাথাচাড়া দিচ্ছে এমনটা বলব না। আমি শুধু বলব যারা এসব কাজে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামীতে যারা জড়াবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিগত সরকারের সময়ে জঙ্গি নাটক সাজাতো, এমন অভিযোগ উঠছে, এখন এই অভিযানগুলো কী স্বচ্ছভাবে হচ্ছে?
জবাবে অতিরিক্ত কমিশনরার শফিকুল ইসলাম বলেন, “কোনো আসামিকে ধরে নাটক সাজানোর কাজ পুলিশের না। পুলিশের কাজ হলো যে অপরাধী তাকে আইনের আওতায় আনা। এই ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি। আমরা বলব আমরা পেশাদারভাবে এই কাজটা করে থাকি।”
ডিবি বলেছে, কামরাঙ্গীরচরের তারা মসজিদ সংলগ্ন কয়লাঘাট এলাকার একটি বাসা থেকে সোমবার রাতে ইমরান চৌধুরীকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মঙ্গলবার ভোরে কেরাণীগঞ্জের জিয়ানগর এলাকা থেকে মোস্তাকিম চৌধুরীকে এবং একই দিন দুপুরে কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর শিকসন ব্রিজ থেকে রিপন হোসেন শেখ ও আবু বক্করকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছে পুলিশ।
মামলায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান-শুটার বন্দুক, ১৪ রাউন্ড গুলি, গুলির খোসা, সাদা পলিথিনে রাখা আনুমানিক ৯০০ গ্রাম বিষ্ফোরক জাতীয় পাউডার, পাঁচ বোতল অ্যাসিড, একটি মেটাল ডিটেক্টর, সামরিক পোশাকের কাপড়, সাতটি ঘড়ির বেল্ট, মেটাল ডিটেক্টর, একাধিক স্মার্টফোন, একটি ড্রোন ও ড্রোন সংক্রান্ত সরঞ্জাম, ‘জিহাদি’ বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, “তাদের কাছ থেকে যে সামরিক পোশাকের কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোকে ‘আরসার ইউনিফরম’ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে তাদের সঙ্গে টিটিপির যুক্ততা পাওয়া গেছে।”
তিনি বলেন, “আরসা সদস্যরা মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বা মিয়ানমারের নাগরিক হয়ে থাকে। তবে গ্রেপ্তার এই চারজনই বাংলাদেশি। এদের মধ্যে দুই ভাই ইমরান ও মোস্তাকিমের বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায়। রিপনের নওগাঁর রানীনগরে আর এবং আবু বক্কর ঢাকার ছেলে, তার বাড়ি কামরাঙ্গীরচরের রূপনগর এলাকায়।”
ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, “সোমবার রাতে আবু বক্কর চীনে যাচ্ছিলেন। শাহজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে যাওয়ার পর তাকে ধরে আনা হয়। তাদের ‘ডিজিটাল ডিভাইসে’ টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।”
রাতে ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য মর্মে স্বীকার করে।”
গত বছরে ১৬ ও ১৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি পল্লি এবং ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গাভিত্তিক আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি-আরসার প্রধান আতাউল্লাহ জুনুনিসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, এরা সবাই রোহিঙ্গা।
আরসা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠা রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সশস্ত্র সংগঠন। সংগঠনটির বিরুদ্ধে নানা সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রভাব বিস্তার, মাদক বাণিজ্য ও সহিংসতার অভিযোগও রয়েছে।
সংঘাতময় মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে (বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে) এখন আরাকান আর্মির সঙ্গে আরসা ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন-আরএসও নামে আরেকটি সংগঠনের লড়াইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসা আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টির মধ্যে ১৪টি প্রশাসনিক এলাকা দখল করেছে, বলা হচ্ছে। এখন জান্তা সরকারের হয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার অভিযোগ আছে আরসা ও আরএসওর বিরুদ্ধে।




