যুদ্ধের পৃথিবী! দুলছে ইউরোপ-এশিয়া
অসম্ভব অহংকার ও ক্ষমতার জোরে আমেরিকান সিনেট যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিল ‘ওয়ার পাওয়ার রেজোল্যুশন’ পাস করে পৃথিবীকে যুদ্ধের কাছে টেনে নিল। অপারেশন এপিক ফিউরির লেলিহান শিখায় হাজার বছরের সভ্যতার চিহ্ন মুছে দিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারাবাহিক বোমা হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। একসঙ্গে নারী-শিশুসহ ইরানের তিন জেনারেশনের ১৩ শ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তার মানে এ যুদ্ধ কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি কোনো ভিডিও গেমও নয়, যা আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেখছি। এ পর্যন্ত কেউ জানে না, এর শেষ কীভাবে হবে। এ যুদ্ধের উত্তাল ঢেউয়ে দুলছে ইউরোপ-এশিয়া। এটি কোনো সামরিক যুদ্ধ নয়; পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্বে থামিয়ে দেওয়া হলো এশিয়াকে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল ‘হরমুজ প্রণালির’ বাণিজ্যপ্রবাহকে থামিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া মোট ৫৭টি কনটেইনারবাহী জাহাজও প্রণালির ভেতরে আটকা পড়েছে। কাতারএনার্জির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ। ইতালি, বেলজিয়াম, চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়েও অনেক বেশি। বিশ্বের ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ। তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক ও ইরানের মতো বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনকারী সমুদ্র ও বিমান চলাচল সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড বলেন, ভৌগোলিকভাবে যুদ্ধের কাছাকাছি থাকার কারণে ইউরোপ-এশিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মানে এই নয়, আমেরিকানরা অক্ষত থাকবে। খোদ আমেরিকায় পেট্রোলের দাম এখন গড়ে ৩ দশমিক ৪১ ডলার প্রতি গ্যালন, যা এক সপ্তাহ আগে ২ দশমিক ৯৮ ডলার ছিল। বিশ্ব হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল—২৮ ফেব্রুয়ারি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বিশাল সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে একযোগে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রথমে ইরানের শাসকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যেন দোজখের আগুনে জ্বলে উঠল তেহরান। অথচ অসম্ভবভাবে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড কর্তৃক প্রকাশিত লক্ষ্যের তালিকা থেকে ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতার উৎসস্থল—তিনটি স্থান (ইসফাহান, পারচিন বা নাতাঞ্জের) অক্ষত রয়ে গেল। এ যুদ্ধে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্র ৯ শ মিলিয়ন সামরিক খাতে ব্যয় করে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এ তিনটি স্থানকে বাদ দিল। আজ পর্যন্ত ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো গত জুনে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়নি। সম্প্রতি প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ ২ মার্চ বলেন, এ অভিযান একটি স্পষ্ট, ধ্বংসাত্মক, সিদ্ধান্তমূলক মিশন: ক্ষেপণাস্ত্র–হুমকি ধ্বংস করা, নৌবাহিনী ধ্বংস করা, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই। মূলত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতির অগ্রাধিকার।
এটা অবাক করার মতো যে মার্কিন অভিযানগুলো এখনো পর্যন্ত এটি প্রতিফলিত হয়নি, ইরান এখনো একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংরক্ষণ করেছে এবং সেই উপকরণগুলোকে অস্ত্রের উপাদানে রূপান্তর করার ক্ষমতাও তাদের থাকতে পারে। শুধু বিমান হামলাই এটি রোধ করতে পারবে, এমনটা অসম্ভব। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে অক্ষম। এটি অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি বিকল্প বেছে নেওয়ার আছে—একটি চুক্তি বাতিল করা অথবা শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে বাধ্য করা—উভয়ই অপ্রীতিকর এবং বিশাল ঝুঁকি বহন করে।
অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ওপর ইরান দাঁড়িয়ে রয়েছে। একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এখনো ইরানের কাছে রয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইরান সরকার কর্তৃক গণবিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করার পরই আবারও আলোচনায় ফিরে আসে ট্রাম্প। ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মূলত তাঁর হুমকি কাজে লাগানোর জন্য। কিন্তু পথে মিশনের ধরন বদলে গেল, ট্রাম্প আবারও পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে ফিরে এলেন। ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন যে তেহরানের উচিত অবিলম্বে তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়া, অন্যথায় তিনি বল প্রয়োগ করবেন। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ট্রাম্প আলোচনায় সম্মত হন, যা তত্ত্বগতভাবে পারমাণবিক সমস্যার একটি নতুন সমাধান খুঁজে পেত। ২৬ ফেব্রুয়ারি আলোচনাটি আরও কারিগরি আলোচনার জন্য একটি ধারণাগত চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়। মাত্র দুই দিন পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
২০০৩ সালে ইরানের প্রয়াত সর্বাচ্চ ধমীয় নেতা খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ তাঁকে হত্যা করা হলো। অপর দিকে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানে আক্রমণ করা ‘অসম্ভব’ হবে। এ দ্বিচারিতার দোলাচালে পশ্চিমা সমালোচকেরা বলছেন, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত ‘চিরকালের যুদ্ধ”’ না করার প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন। বাস্তবে বিপরীতটি সত্য। ট্রাম্প ইরানে চিরকালের যুদ্ধ শুরু করছেন না; তিনি একটি যুদ্ধের অবসান চাচ্ছেন। এ প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্পের পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে বলে সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয় কলামে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটনকে এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যাতে দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে না দিয়ে এ যুদ্ধে অর্জিত সাফল্য একটি নিরস্ত্র ও বিকৃত ইরান সুরক্ষিত থাকে। এ যুদ্ধের সমাপ্তি ও সাফল্যকে আরও জোরদার করার এখনো উপায় আছে। যথারীতি কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। হয়তো একসময় এ যুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাবে এবং কেউই এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।




