যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটে ইরানি কুর্দিদের সতর্ক করল সিরিয়ার কুর্দিরা
ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী হওয়ার ক্ষেত্রে ইরানি কুর্দিদের সতর্ক করেছে সিরিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলের কুর্দিরা।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সিরিয়ায় তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তাকে প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে তারা বলছে, কাজ ফুরালে ওয়াশিংটন ইরানি কুর্দিদেরও ‘পরিত্যাগ করবে’।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মুহুর্মূহু বিমান হামলার মধ্যেই ইরাকের উত্তরাঞ্চলে থাকা ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পশ্চিম ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ করা হবে কিনা, হলে কীভাবে, এসব নিয়ে আলোচনা করেছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স আগেই এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল।
কিন্তু সিরীয় কুর্দিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মেলানোর ব্যাপারে তাদের ইরানি ‘বন্ধুদের’ সাবধান করছে।
“আশা করবো ইরানের কুর্দিরা আমেরিকার সঙ্গে মিত্রতা করবে না, কারণ তারা তাদের পরিত্যাগ করবে। আগামীকাল যদি তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে ইরানিদের সমঝোতা হয়, তারা তোমাদের নির্মূল করে দেবে। আমাদের মতো ভুল করো না,” রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন উত্তরপূর্ব সিরিয়ার কুর্দিদের শহর কামিশলির ৪৫ বছর বয়সী বাসিন্দা সাদ আলি।
‘বিশ্বাসঘাতক’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’
জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে লড়াইয়ে এক দশকেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল সিরীয় কুর্দি যোদ্ধারা; উগ্র কট্টর ইসলামপন্থি যোদ্ধাদের কাছ থেকে এলাকা দখল নিয়ে গড়ে তুলেছিল নিজেদের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।
কিন্তু এ বছরের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার অধীনে থাকা সিরিয়ার নতুন সেনাবাহিনী ত্বরিৎ অভিযান চালিয়ে ওই কুর্দি অঞ্চলের বেশিরভাগটাই নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিয়েছে।
সিরিয়ার কুর্দিরা সেসময় যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের পক্ষ নিয়ে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়েছিল, কিন্তু ওয়াশিংটন ‘বিশ্বাসঘাতকতা করে’ উল্টো তাদেরকে শারা’র বাহিনীর সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যাওয়ার তাগাদা দেয়।
এই ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে সিরীয় কুর্দিদের, যেখান থেকে ইরানি কুর্দিদেরও শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে তারা মনে করে।
“ইরানে কুর্দি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দৃঢ়, লিখিত নিরাপত্তা ছাড়া তারা ইরানের ভূখণ্ডের ওপর কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়াবে না—ইরানি কুর্দিদের এমন শক্ত অবস্থান নেওয়া উচিত বলেই আমার মত,” বলেছেন কামিশলির ২৬ বছর বয়সী বাসিন্দা আমজাদ কারদো।
“আমরা সিরিয়ার কুর্দিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি—বিশেষত সিরিয়ায় কুর্দি প্রতিরোধ আন্দোলনকে তারা যেভাবে পরিত্যাগ করেছে,” বলেছেন তিনি।
ইরানি কুর্দিদের একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, উত্তর সিরিয়ার কুর্দি গোষ্ঠীগুলো যে ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে’, সেরকম শঙ্কা তাদের নেতাদেরও আছে। এ কারণেই ইরানি কুর্দি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু বিষয়ে নিশ্চয়তা চেয়েছে, তবে সেগুলো কী সূত্রটি তা জানায়নি।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কুর্দি বাহিনীগুলো যদি উত্তর ইরাক থেকে সীমান্ত টপকে ইরানে ঢুকে পড়ে তাহলে ‘চমৎকার’ হবে।
সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে আকাশপথে সহায়তা দেবে কিনা, সে প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি।
শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার অবস্থান বদলে সাংবাদিকদের জানান, তিনি চান না কুর্দি যোদ্ধারা ইরানে যাক।
‘চরম সতর্কতা’ দেখতে চায় সিরীয় কুর্দিরা
সিরিয়ার কুর্দিশ প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান আহমেদ বারাকাত রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী হওয়ার ক্ষেত্রে ইরানি কুর্দি বাহিনীগুলোর ‘চরম সতর্কতা’ অবলম্বন করা জরুরি।
“সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তাদের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই বা তাদের দুর্বল করার ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী বাহিনীর ভূমিকা পালন করা এই মুহূর্তে ইরানি কুর্দিদের জন্য ভালো হবে না বলেই আমার বিশ্বাস,” বলেছেন তিনি।
আধা-স্বায়ত্তশাসিত ইরাকি কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা ইরানি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইসরায়েল বছরখানেক ধরেই আলাদা আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে বলে দিনকয়েক আগেই রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল।
কুর্দিরা এমন এক জাতিগোষ্ঠী, এক শতাব্দী আগে অটোমান সাম্রাজ্য ধসে পড়ার পর যখন আধুনিক পশ্চিম এশিয়া নতুন মানচিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়, তখনই তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল।
এদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলমান, তারা যে ভাষায় কথা বলে তার সঙ্গে ফারসির মিল রয়েছে। আর্মেনিয়া, ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও তুরস্ক—এ পাঁচটি দেশের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলে তাদের বসতি।
এর মধ্যে ইরাকেই কেবল উত্তরের যে তিনটি প্রদেশে তাদের বাস, সেখানে নিজেদের আঞ্চলিক সরকার বানাতে পেরেছে কুর্দিরা। কিন্তু ইরান, তুরস্ক আর এখন সিরিয়া সব জায়গাতেই তাদের আলাদা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বা রাষ্ট্র পাওয়ার স্বপ্ন অধরা রয়ে গেছে।





