ভূমধ্যসাগরে ১২ যুবকের মৃত্যু, দিরাইয়ে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মামলা
লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় দিরাই থানায় দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, প্রতারণার মাধ্যমে বিপজ্জনক পথে পাঠিয়ে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বাসুরী গ্রামের নিহত সুহানুর রহমান এহিয়ার বাবা সালিকুর রহমান বাদী হয়ে সোমবার রাতে দিরাই থানায় মামলাটি দায়ের করেন বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী।
মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন— উপজেলার তারাপাশা গ্রামের মৃত আকিব উল্লাহর ছেলে মুজিবুর মিয়া, জগদল গ্রামের মাওলানা ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে ইতালিপ্রবাসী সালেহ আহমেদ, জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁও গ্রামের ছায়েক আহমেদ এবং ছাতক উপজেলার জসিম মিয়া। এছাড়া আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন।
ওসি এনামুল হক চৌধুরী বলেন, `সন্তান হারানো সালিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, দালাল চক্র প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়ে গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তার ছেলেসহ অন্যদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, “চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে দিরাইয়ের ৬ জনসহ সুনামগঞ্জের মোট ১২ জন যুবকের মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে, মৃত্যুর পর তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন রয়েছেন— চিলাউড়ার শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), একই গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ জনি (২৫), পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম) গ্রামের প্রাক্তন শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬) এবং ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২)।
দিরাই উপজেলার নিহত ছয়জন হলেন— কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের সাইদ সরদারের ছেলে নূরুজ্জামান ময়না (৩০), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫), আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮); রাজানগর ইউনিয়নের ররনারচর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে উপজেলা যুবদলের সদস্য মজিবুর রহমান (৩৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমান এহিয়া (২৮) এবং করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (৩০)।
এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিমও মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতদের স্বজনরা জানান, তারা এক থেকে পাঁচ মাস আগে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ‘গেইমে তুলে’ তাদের গ্রিসে পাঠানোর জন্য বোটে তোলা হয়। এ জন্য প্রত্যেককে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দালালদের দিতে হয়েছে।
মামলার বাদী সালিকুর রহমান বলেন, “জগদল গ্রামের মাওলানা ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে ইতালি প্রবাসী সালেহ আহমদের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে ইউরোপ যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তার সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে পাঠিয়েছিলাম। গত ২২ মার্চ ছেলের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলছিল, আব্বা আমার কষ্ট হচ্ছে। খাবার নেই, পানি নেই। এরপর থেকে আমি দালাল সালেহ আহমদকে ফোন দিলে সে ফোন ধরেনি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলের মৃত্যুর খবর জানার পর একাধিকবার ফোন দিলেও সে এখন পর্যন্ত ফোন রিসিভ করেনি।”
একই অভিযোগ করেন মাটিয়াপুর গ্রামের নিহত তায়েফ মিয়ার বাবা আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে শিপে নেওয়ার জন্য ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়। পরে নিরাপদে নেওয়ার কথা বলে আরও এক লাখ টাকা বাড়িয়ে ১৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু দালালরা হাওয়ার বোটে তাদের পাঠায়। সেখানেই খাবার ও পানির অভাবে তারা মারা যায়। আমরা এর বিচার চাই।”
তবে মামলার আসামিদের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।




