‘ক্ষমতাবানরা বিশ্ববাসীকে নিয়ন্ত্রণহীন দুনিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সুইজারল্যান্ডের পর্যটন শহর দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সাবলীল ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর গল্প। তিনি কিছু ‘পুরোনো’ কথা নতুন করে তুলে ধরেন নতুন বাস্তবতায়।
বক্তব্যের শুরুতেই সততার প্রসঙ্গ টানলেন তিনি। জানালেন— সততার জোর বদলে দিতে পারে চাপিয়ে দেওয়া সব বন্দোবস্ত। শোনালেন মূল্যবোধের বাণী। ক্ষমতাবানের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করলেন, ভর্ৎসনা করলেন তাদের দাম্ভিকতার।
গত ২০ জানুয়ারি দাভোসের অনুষ্ঠানস্থলে প্রায় ১৭ মিনিটের বক্তব্যে কার্নি শুধু সমতার পক্ষে বা দমনের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হননি, পরিবর্তিত বিশ্ব-পরিস্থিতিতে তিনি দিয়েছেন পথ-নির্দেশনাও।
তিনি সাবলীল ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর গল্প। ‘বেড়ালের গলায় ঘণ্টি বাঁধা’র দায়িত্ব অথবা সবাইকে সতর্ক করার দায় একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনিই যেন প্রথম নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।
দাভোসে তার সেদিনের আর্তি ও আর্জি আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়েছে।
কোনো রাখঢাক বা ভণিতা না করেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলে দিলেন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় ‘ফাটল’ ধরার কথা। যেন ‘প্যানডোরার বাক্স’ খুলে দিলেন তিনি। বললেন, ‘বিশ্বব্যবস্থায় যে ফাটল দেখা দিয়েছে আজ আমি সে সম্পর্কেই বলবো। একটি সুন্দর কল্পকাহিনির যবনিকা হয়েছে। শুরু হয়েছে নিকষ বাস্তবতা।’
তার মতে, ভূ-রাজনীতি ও ক্ষমতাবানরা বিশ্ববাসীকে এক লাগামছাড়া, নিয়ন্ত্রণহীন দুনিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
‘বিপরীতে, বলবো কানাডার মতো মধ্যম সারির দেশগুলো এখন আর ক্ষমতাহীন নয়। এ দেশগুলো মানবিক মূল্যবোধ, তথা—মানবাধিকার, স্থিতিশীল উন্নয়ন, সহমর্মিতা, সার্বভৌমত্ব ও সব রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আজ নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষমতা রাখে।’
এরপর তিনি শোনালেন সেই অমেয় বাণী—’সততার মধ্য দিয়ে জেগে উঠেছে ক্ষমতাহীনের ক্ষমতা।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি এই কথাগুলো ফরাসিতে বলেছিলেন। এরপর শুরু করেন ইংরেজিতে বলা।
বিশ্বজুড়ে বিশ্বশক্তিগুলোর বিদ্যমান বিবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মার্ক কার্নি বলেন, ‘প্রতিদিনই মনে রাখতে হয় যে, আমরা মহাক্ষমতাধরদের নিজ নিজ স্বার্থের দ্বন্দ্বপূর্ণ মহাকালের মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছি। আইনের শাসন আজ সংকটে। ক্ষমতাবানরা যা খুশি তাই করতে পারেন। আর দুর্বলদের সহ্য করতে হয় ক্ষমতাসীনদের পীড়ন।’
‘অনেকে মনে করেন ক্ষমতাবানদের কথা মতো চললে তাদের মন পাওয়া যায়। অথবা, তাদের তাঁবেদারি করলে ঝামেলা এড়ানো যায়। অথবা, তাদের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে থাকার আশা জাগিয়ে রাখা যায়।’
কুইবেক অঙ্গরাজ্যের শীতকালীন উৎসবের মাসকট বনহম কারনাভালের সঙ্গে নাচের ভঙ্গিমায় ছবি তুলেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি।
‘আসলে আমরা মানিয়ে নেওয়ার খাতিরে শক্তিধর দেশগুলোর কথা মেনে নিই,’ উল্লেখ করে মার্ক কার্নি মন্তব্য করেন, ‘কিন্তু, বাস্তবে তা আর হওয়ার নয়।’
‘তাহলে আমাদের রক্ষাকবচ কী?’—এমন প্রশ্নে ছুড়ে দিয়ে এই নেতা এর ঐতিহাসিক জবাব টানেন ইতিহাস থেকে। বলেন, ১৯৭৮ সালের এক ঘটনা। সে বছর চেক রাষ্ট্রপতি ও স্বনামধন্য লেখক ভাকলাভ হাভেল ‘ক্ষমতাহীনের ক্ষমতা’ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। বিষয়—কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা কিভাবে টিকেছিল। এক মুদি দোকানদারের গল্পের মধ্য দিয়ে একটি অন্যায্য শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা ও ধসে পড়ার কাহিনি তুলে ধরেন মার্ক কার্নি।
এরপর ব্যাংক অব কানাডা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের এই সাবেক গভর্নর এবং বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী সেই ঘটনার সবিস্তার তুলে ধরেন। বলেন: সেই মুদি দোকানদার প্রতিদিন সকালে তার দোকানের জানালায় একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখতেন। তাতে লেখা থাকতো—’দুনিয়ার মজদুর এক হও’। সেই দোকানদার নিজেও এমন স্লোগানে আস্থা রাখতেন না। অন্যরাও না। তবুও এমন আপ্তবাণী ঝুলিয়ে রাখতে হতো, যাতে কেউ হাঙ্গামা না করে।
কমিউনিস্ট সরকারের নির্দেশনা মেনেই সেই দোকানদার সাইনবোর্ডটি তার দোকানের জানালায় ঝুলিয়ে রাখতেন। অন্য দোকানদাররাও তাই করতেন স্রেফ ঝামেলা এড়ানোর জন্য। আর এভাবেই সংঘাত ছাড়াই তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে ছিল।
দুনিয়ার মজদুর এক হতে পারবে না জেনেও সাধারণ দোকানিরা সেই স্লোগান-সম্বলিত সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়ে রাখতেন। আর ধামাচাপা দিয়ে রাখতেন প্রকৃত সত্যকে।
চেক রাষ্ট্রপতি হাভেল একে আখ্যা দিয়েছিলেন, ‘মিথ্যার রাজ্যে বসবাস’ বলে।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশের সরকার প্রধানরা ড্রতে অংশ নিচ্ছেন। বাম থেকে ডানে: ট্রাম্প (যুক্তরাষ্ট্র), ক্লদিয়া (মেক্সিকো) এবং কার্নি (কানাডা)।
চেক প্রজাতন্ত্রের নেতা হাভেলের মতো কানাডার নেতা কার্নিও জানিয়ে দিলেন মিথ্যায় ‘বিজয়’ বেশিদিন টেকে না। কারণ, এমন শাসনব্যবস্থার শক্তির পেছনে সত্য বা সততা নেই। রাষ্ট্রীয়সন্ত্রাসকে ‘মেনে নেওয়ার’ অভিনয়কে ক্ষমতাসীনরা ‘সত্য’ ভেবে বসেন। তাই তাদের ক্ষমতার মসনদ ধ্বংস হয় সেইসব সাধারণ মানুষের হাতেই।
যদি একজন সাধারণ ব্যক্তিও ক্ষমতাবানের চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম ‘মেনে নেওয়া’র অভিনয় থামিয়ে দেন, তাহলেই পুরো শাসনব্যবস্থা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।
একদিন সেই মুদি দোকানদার ক্ষমতাসীনদের চাপিয়ে দেওয়া সেই মিথ্যা স্লোগানের সাইনবোর্ড ঝোলানো বন্ধ করে দিলে, ধীরে ধীরে অন্য দোকানিরাও তা করতে থাকেন। একসময় সাধারণ মানুষের হাতেই বিভ্রান্তিতে গা ভাসানো ক্ষমতাসীনদের পতন হয়। সেই ফেলে দেওয়া সাইনবোর্ডের মতোই তারা ভাগাড়ে গিয়ে পড়েন।
এ গল্প শোনানোর পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী ডাক দেন—’বন্ধুরা, সেই সাইনবোর্ড ছুড়ে ফেলার সময় এসে গেছে।’
পাশাপাশি তুলে ধরেন বছরের পর বছর ধরে কানাডা কিভাবে নিয়ম মেনে চলেছে। উত্তর আমেরিকার দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন মেনে কিভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। কার্নি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোয় যোগ দিয়েছি। আমরা নিয়মনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। এর সুবিধাগুলো আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। এ কারণে, আমরা এখনো আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মূল্যবোধ ধরে রাখার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি।’
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইনের শাসন মেনে চলার যে ধারণা প্রচলিত আছে তাতে মিথ্যার যোগ আছে, বলে মনে করেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, বিশ্বমঞ্চে আইনের শাসন মেনে চলার যে বয়ান দেওয়া হয় তা পুরোটা সত্য নয়। কেননা, ক্ষমতাবানরা অনেক অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মনীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমরা আরও জানি যে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারেও শাসক ও শোষিতের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।’
তবে কার্নি মনে করেন—এসবেরও প্রতিমূল্য আছে। আমেরিকার আধিপত্যের কারণে সবার ঘরে খাবার পৌঁছাচ্ছে। সাগরে জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত আছে। স্থিতিশীল অর্থব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সম্মিলিতভাবে সবার নিরাপত্তা বিধান করা গেছে। সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে।
‘তাই আমরা নীরবে সেই মুদি দোকানদারের মতো শান্তির বাণী সম্বলিত সাইনবোর্ডটি আমাদের জানালার পাশে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। তাই আমরা নিয়ম-অনিয়মের পার্থক্য জোরালোভাবে তুলে ধরার দায় থেকে দূরে সরেছিলাম।’
‘সেই ভণিতার দিন শেষ। এখন সরাসরি বলতে হবে। আমরা ভাঙনের মুখে পড়েছি। নিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তনের মুখে নয়।’
তার মতে—গত দুই দশক ধরে অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত, জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংকট দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বৈশ্বিক একতা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। কোনো বিশেষ বিশ্বশক্তির নাম না নিয়ে তিনি জানান—অতি সম্প্রতি দেখা গেল এক বিশ্ব মোড়ল নিজেদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। শুল্ককে নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগিয়েছে। নিজেদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে অন্যের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে দিয়েছে। এমনকি, তারা পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাকে অন্যের দুর্বলতার প্রতীক মনে করে শোষণ করে যাচ্ছে।
কার্নির এমন বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার পর কানাডাসহ শত্রু-মিত্র সব দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তাই যেন শান্ত ভঙ্গিমায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কার্নি বললেন, ‘একতার নামে এমন মিথ্যার জগতে কেউ আর থাকতে চায় না। এটি সবার জন্য সুখকর হবে— এমন ভাবনাও কুহেলিকা বটে। কেননা, এখানে একতার অর্থ হচ্ছে অধীনতা।’
হলোকাস্টে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কার্নি ও অন্যান্য নেতারা।
কার্নির ভাষ্য— জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জলবায়ু সম্মেলনের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মধ্যমশক্তির দেশগুলো নির্ভর করেছিল। সবাই মিলে সমস্যা সমাধানের যে বাসনা সবার মনে ছিল তা আজ হুমকিতে। তাই অনেক দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য, জ্বালানি, দুর্লভ খনিজ, অর্থনীতি ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আনার।
‘এর কারণ এখন সহজেই বোঝা যাচ্ছে,’ উল্লেখ করে কানাডার প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যে দেশ নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করতে পারে না, নিজের জ্বালানির জোগান নিজে দিতে পারে না, নিজের নিরাপত্তা নিজের হাতে রাখতে পারে না, সেসব দেশের বিকশিত হওয়ার সুযোগ কম।’
‘যদি আইন কাউকে রক্ষা করতে না পারে তাহলে নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়,’ বলে মনে করেন কার্নি।
‘এমন পরিস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়েও পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার,’ বলেও মত দেন তিনি।
তার মন্তব্য: নিজেদের নিরাপত্তায় ‘দেশে দেশে দুর্গ গড়ে তুলতে’ গেলে সবার পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে। সবাই আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। সবকিছু ভঙ্গুর হয়ে যাবে।
‘এর বিপরীত সত্যও আছে’ উল্লেখ করে কার্নি আরও জানান—এমনকি, ক্ষমতা ও স্বার্থলোভী বিশ্বশক্তিগুলো যদি নিয়মনীতি বা মূল্যবোধ নিয়ে তাদের অভিনয় বন্ধ করে দেয়, তবুও সবার একতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
তার বিশ্বাস, ‘আধিপত্যবাদীরা পারস্পরিক সুসম্পর্ককে সবসময় টাকা-পয়সার নিরিখে বিবেচনা করলে তা যৌক্তিক হবে না। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ নতুন নতুন বন্ধু খুঁজে বেড়াবে।’
কার্নি বলেন, ‘তারা নিশ্চয়তা খুঁজবে। তারা নিজেদের সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষার সুযোগ খুঁজবে। এই সার্বভৌমত্ব এক সময় নিয়মনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল। এখন তারা বহিঃশক্তির অযাচিত চাপ সহ্য করার সক্ষমতা বাড়ানো চেষ্টা করবে।’
‘সবাই জানেন এটি ঝুঁকি মোকাবিলার এক পুরোনো পদ্ধতি। ঝুঁকি মোকাবিলার জন্যও একটা দাম চুকাতে হয়। স্বশাসন ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে টিকে থাকার খরচ সবাই মিলে দেওয়া যেতে পারে।’
তিনি মনে করেন, ‘সবাই টাকা দিলে নিরাপত্তা খরচ কমে যাবে। অন্তত নিজেদের দুর্গ তৈরির খরচ লাগবে না। সবাই মান বজায় রাখলে মানহীনতার দাপট বিলীন হয়ে যাবে। অন্যের প্রশংসা করলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।’
কাতারের আমিরের সঙ্গে কার্নি।
‘মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তবতা’
একটি মধ্যমশক্তির দেশ হিসেবে কানাডা এই নতুন বাস্তবতা কিভাবে মেনে নেবে সে বিষয়েও কথা বলেছেন কার্নি। তার মতে, ‘আসল বিষয় হচ্ছে এমন বাস্তবতা অবশ্যই মেনে নিতে হবে। তবে প্রশ্ন—আমরা কি দেয়াল তৈরিতে বেশি খরচ করে ফেলবো, নাকি আরও উচ্চাভিলাষী কিছু নিয়ে ভাববো।’
এই সতর্কবাণী শুনে কানাডা সবার আগে সচেতন হয়েছে জানিয়ে কার্নি আরও বলেন, ‘এর ওপর ভিত্তি করে আমরা আমাদের কৌশলগত দিকগুলো সাজিয়ে নিচ্ছি।’
তিনি জানান, কানাডার জনগণ মনে করেন যে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও জোটবদ্ধতা তাদেরকে সমৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তা দিয়েছে। এখন আর সেই ভাবনায় কাজ হচ্ছে না। এখন কানাডাবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি আলেক্সান্ডার স্টাবের মতো। তিনি বলছেন, ‘মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তবতা’র কথা।
কার্নি তার ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণে ন্যায়নীতি, মূল্যবোধ, বাস্তববাদী ভাবনা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, বল প্রয়োগ না করা, জাতিসংঘের সনদগুলোর প্রতি আনুগত্য, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি ভাবনার বৈচিত্র্যের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা খোলা মনে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। পৃথিবীটাকে কেমন দেখতে চাই তার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। সবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কগুলো যাচাই করে নিচ্ছি। আমাদের মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করবে এসব সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু হয়। সবার সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রভাব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যেসব ঝুঁকি দেখা দিয়েছে বা আগামীতে যেসব ঝুঁকি আসতে যাচ্ছে—এসবই মার্ক কার্নি সৌহাদ্যপূর্ণ পরিবেশের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চান। তিনি শুধু মূল্যবোধের নিজস্ব ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে চান না, তিনি ক্ষমতার মূল্যবোধের ওপরও নির্ভর করতে চান। নিজ দেশে সেই সক্ষমতা তৈরি করছেন বলেও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
কানাডার শক্তি
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ লিবারেল পার্টির নেতা মার্ক কার্নি কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন সেগুলোও দাভোসের বক্তব্যে তুলে ধরা হয়। আয়কর কমানোর পাশাপাশি তিনি প্রদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে কেন্দ্রীয় সরকারের নানাবিধ বাধা দূর করার কথাও জানিয়েছেন।
কানাডায় জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দুর্লভ খনিজ ও বাণিজ্যখাতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আনতে তার সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোও তিনি জানিয়ে রেখেছেন। চলতি দশকের মধ্যে প্রতিরক্ষাখাতে খরচ দ্বিগুণ করার কথাও বলেছেন।
কানাডায় আরও শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কথাও বক্তব্যে যোগ করেন কার্নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও কাতারের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সইয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা উপকরণ কেনা এবং ভারত, আসিয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার কথাও জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়াও, তিনি স্বার্থ ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রুশ আগ্রাসনের কবলে পিষ্ট ইউক্রেনের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন।
উত্তর মেরু তথা আর্কটিক অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ডের ভাগ্য গ্রিনল্যান্ডবাসীর ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।
উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোর সঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি সেই বরফাচ্ছাদিত মেরু অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানে কানাডার অংশগ্রহণের কথা বলেছেন। সেখানে সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন।
‘তৃতীয় পক্ষ’
মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করায় ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের নিন্দা করে অটোয়া সবার লক্ষ্যপূরণে সমঝোতার ভিত্তিতে আর্কটিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় বলেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন মার্ক কার্নি।
এ বিষয়ে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ইউরোপের যে আট দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতা করেছে আগামী ১ জুন থেকে সেসব দেশের পণ্যের ওপর বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বহুজাতিক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে কানাডা প্রশান্ত মহাসাগরের দুই তীরের দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতায় মন দিয়েছে জানিয়ে মার্ক কার্নি জানান, অটোয়া ১৫০ কোটি মানুষকে নিয়ে একটি নতুন বাণিজ্যিক জোট গড়তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
তিনি আরও জানান, শিল্পোন্নত সাত দেশকে সঙ্গে নিয়ে কানাডা দুর্লভ খনিজপণ্যের নতুন সংঘ গড়তে চায়। যাতে, এমনসব পণ্যের বাজার একক কারও হাতে জিম্মি না হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে অটোয়া সমমনা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা গড়তে চায়। যাতে, এই খাতে কোনো একাধিপত্য গড়ে না উঠে।
তার ভাষায়, ‘এটি কোনো সাদামাটা বহুজাতিকতা নয়, অথবা, সেসব দেশের ওপর নির্ভরশীলতা নয়। এটি হচ্ছে এমন একটি জোট, যা সমমনাদের সঙ্গে সম্পদ ভাগ করে নেবে।’
তার দৃষ্টিতে—বিশ্বের অধিকাংশ দেশই কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
একইভাবে, কানাডা ভবিষ্যতের সংকট ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে গভীর বন্ধন সৃষ্টি করতে চায়। শুধু চাওয়া নয়, এ বিষয়ে কার্নি সবাইকে সতর্কও করে দিয়েছেন। তিনি আশঙ্কা করে বলেন, ‘মধ্যমশক্তির দেশগুলোকে অবশ্যই এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা যদি এগিয়ে না আসি তাহলে বিলীন হয়ে যাবো।’
তিনি মনে করেন, মহাক্ষমতাধর দেশগুলো নিজেরাই হয়ত এককভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারবে। কেননা, তাদের আছে পণ্যের বিশাল বাজার, দুর্ভেদ্য সমরশক্তি ও বিশ্বমঞ্চে মোড়লিপনার ক্ষমতা। এগুলো মধ্যমসারির দেশগুলোর নেই।
‘আমরা যখনই আধিপত্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষিতে বসি তখন আমাদের দুর্বলতাগুলো বেরিয়ে আসে। তারা যেভাবে বলে আমাদেরকে সেভাবে চলতে হয়। একটু সুবিধা পাওয়ার জন্য নিজেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করি।’
দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কার্নি বলেন, ‘একে সার্বভৌমত্ব বলে না। এটি দাসত্ব মেনে নিয়ে সার্বভৌমত্বের অভিনয় বৈকি।’
তিনি মনে করেন, ‘যেখানে মহাশক্তিধর দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বৈরিতা করছে, সেখানে অন্যদেশগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে কার্যকর তৃতীয় পক্ষ গড়ে তুলতে পারে।’
অটল অটোয়া
কার্নি আইনের শাসনের বিষয়ে কারও সঙ্গে আপস করতে নারাজ। তিনি আবার সাবেক চেক রাষ্ট্রপতি হাভেলের কথায় ফিরে যান। প্রশ্ন রাখেন, ‘মধ্যমশক্তির দেশগুলো যে সততার সঙ্গে জীবন কাটানোর নীতি নিয়েছে—আসলে এর মানে কী?’
নিজের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রথম মানে হচ্ছে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া। আইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা যাতে ভেঙে না পড়ে সেই ব্যবস্থা করা। এই বিশ্বব্যবস্থা বিজ্ঞাপনের জোরে টিকে আছে। এটি হয়ত মোড়লদের মোড়লিপনা আরও বাড়িয়ে দেবে। এই মোড়লরা শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে। অর্থনৈতিক একতাকে জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে।’
তাই ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক কাজ করে যেতে হবে, বলে মনে করেন কানাডার কার্নি। তার মতে, শত্রু-মিত্র সবার জন্য সমান মানদণ্ড খাটাতে হবে। ‘যখন এক দেশ থেকে অর্থনৈতিক চাপ আসে তখন মধ্যমশক্তির দেশগুলো এর সমালোচনা করে। কিন্তু, এই চাপ যখন অন্যদিক থেকেও আসে তখন চুপ হয়ে যায়। আসলে, আমরা যেন সবাই সেই দোকানির মতো জানালার পাশে সেই ভণ্ডামির স্লোগানটি ঝুলিয়ে রেখেছি।’
‘এর মানে হচ্ছে, আমরা যা বিশ্বাস করি তাই করবো। সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবে আমরা পুরোনো ধ্যানধারণাকে আঁকড়ে থাকবো না। এর মানে, নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন নতুন চুক্তি করতে হবে। নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে এমন কিছু করা যাবে না। নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে।’
সব সরকারকে এখনই অগ্রাধিকার হিসেবে এ কাজে হাত দেওয়ার আহ্বান জানান মার্ক কার্নি।
তিনি মনে করেন, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বৈচিত্র্য আনাকে শুধু অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি সৎ পররাষ্ট্রনীতির ভৌত-ভিত্তি। দুর্বল দেশগুলোরও অধিকার আছে প্রতিশোধের পথে না ছুটে মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার।
কার্নি বলেন, ‘বিশ্ববাসী যা চায় কানাডার তা আছে। জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা সুপারপাওয়ার। আছে দুর্লভ খনিজপণ্যের বিশাল ভাণ্ডার। কানাডা সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত মানুষের দেশ। আমাদের অবসর ভাতার তহবিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড়। এটি বাস্তববাদীদের বিনিয়োগের ঠিকানা। এ ছাড়াও, আমাদের টাকা ও মেধা আছে। সরকারের হাতে অনেক টাকা আছে, যাতে সরকার নিশ্চিত মনে কাজ করে যেতে পারে। আমরা এমনসব মূল্যবোধ মেনে চলি যা অনেকের স্বপ্ন।’
কানাডার বহুজাতিক সমাজব্যবস্থা বেশ কার্যকর বলেও মন্তব্য করেন মার্ক কার্নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাঠ-ময়দানগুলো মুক্ত এবং জন-কোলাহলে পূর্ণ থাকে। কানাডা স্থিতিশীলতা চায়। সারাবিশ্বে আমরা বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে সমাদৃত। আমরা সবার সঙ্গে সুদীর্ঘ সম্পর্ক তৈরি করি এবং তা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিই।’
‘আমাদের ভিন্ন কিছু আছে। চারপাশে কী ঘটছে আমরা তা জানি। সেই মোতাবেক কাজ করার দৃঢ়তা আমাদের আছে। আমরা জানি, বিশ্বব্যবস্থায় আজ যে ফাটল ধরেছে তা সারিয়ে নেওয়ার মতো না। পৃথিবীতে এখন সততার প্রয়োজন।’
অনিশ্চিত পথ
কানাডার প্রধানমন্ত্রী আবারও জানালার পাশে সেই সাইনবোর্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পুরোনো ব্যবস্থা আর ফিরে আসবে না। এর জন্য দুঃখ করে লাভ নেই। স্মৃতিকাতরতা কোনো কৌশল হতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি যে ফাটলের এই বাস্তবতা থেকে আমরা মহৎ কিছু সৃষ্টি করতে পারবো। অনেক বড়, অনেক শক্তিশালী বা আরও আরও ভালোকিছু তৈরি করা সম্ভব হবে।’
‘এই কাজটা মধ্যমশক্তির দেশগুলোকে করতে হবে’ জানিয়ে কার্নি আরও বলেন, ‘পৃথিবীটা দুর্গ-প্রাকারে আটকে গেলে এসব দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। বরং প্রকৃত সহযোগিতার মাধ্যমে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব।’
বলশালীর পেশীতে বল আছে। কিন্তু, সবারই কিছু না কিছু ক্ষমতা থাকে। কার্নির দৃষ্টিতে— কারও আছে অভিনয় আর না করার ক্ষমতা। কারও আছে বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা। কারও আছে নিজের শক্তি বাড়ানোর ক্ষমতা। কারও আছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার ক্ষমতা।
এটাই কানাডার ভাষ্য— একথা জানিয়ে দেশটির নেতা বলেন, ‘আমরা এ পথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং খোলা মনে বেছে নিয়েছি। এই পথ সবার জন্য খোলা। যেকেউ চাইলে এই জোটে যুক্ত হতে পারে।’
এরপর সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তার বক্তব্য শেষ করেন।





