উপাচার্যের পদত্যাগ চেয়ে ইউএপি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার পর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।
কিন্তু মঙ্গলবারও রাজধানীর গ্রিন রোডে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন একদল শিক্ষার্থী। তারা এখন ভিসি অধ্যাপক কামরুল আহসানের পদত্যাগসহ ১৬ দফা দাবি জানাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সোমবার বিকালে শিক্ষার্থীদের ইমেইল পাঠিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধের সিদ্ধান্ত জানায়।
শায়েখ আহামাদুল্লাহর সঙ্গে ছবি তোলার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শমসাদ আহমেদকে শোকজ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদে এবং সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে ‘হিজাব পরায় ছাত্রীকে হেনস্তার’ অভিযোগ তুলে গত রোববার আন্দোলন শুরু করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে রোববারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির ও বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীনকে চাকরিচ্যুত করে নোটিস জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীনের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ততার’ অভিযোগ এনেছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন মাস্টার্সের ছাত্র মো. মারুফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের একজন শিক্ষক শায়েখ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে ছবি তোলায় তাকে শোকজ করা হয়। সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির শুরু থেকেই ইসলামী মাইন্ডেডদের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেন। সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তিনি হাদির গুলি খাওয়ার পোস্টে ‘হা হা রিয়েক্ট’ দিয়েছিলেন। ওই দুই শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমরা এখন ভিসির পদত্যাগসহ ১৬ দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছি।
আন্দোলনরত এ শিক্ষার্থীর ভাষ্য, লায়েকা বশির ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অনলাইন পরীক্ষায় এক নারী শিক্ষার্থী হিজাব পড়ায় তার সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেন। গত ১০ ডিসেম্বরও তিনি হিজাব নিয়ে কটূক্তি করে ফেইসবুকে পোস্ট দেন। এর জেরে শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো রকম কারণ দর্শানো ছাড়াই আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে৷ শিক্ষার্থীরা আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনছে তা ঠিক নয়। অনলাইন পরীক্ষায় শিক্ষার্থী যদি মুখ ঢেকে থাকে, তাহলে তাকে শনাক্ত করা যায় না। ভাইভা নেওয়ার জন্য পরিচয় নিশ্চিত হতে হয়। তাই কোভিডের সময় এক ছাত্রীকে অনলাইন ভাইভায় মুখ খুলতে বলেছিলাম। সেই ভিডিও এখন সামনে এনে অপপ্রচার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমি গত ডিসেম্বরে ঢাকার মোহাম্মদপুরে জোড়া খুনের ঘটনার প্রেক্ষাপটেই একটা পোস্ট দিয়েছিলাম মুখ ঢেকে রাখা বিপজ্জনক উল্লেখ করে। সেটা শুধু বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করা থাকলেও তার ক্রিনশট ছড়িয়ে পরে, আমার কোনো ফেইসবুক বন্ধুই হয়ত ছড়িয়েছে।
সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীন গণমাধ্যমকে বলেন, আমি ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করি ইতিহাসে, আমি আমার ব্যাচের টপার ছিলাম। আমি আওয়ামী লীগে সম্পৃক্ত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হতাম। এ অভিযোগ সত্য নয়। তারা যে ফেইসবুক পোস্টে রিয়্যাক্টের কথা বলছে, ওই পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায় না। মব জেনারেট করতে ওই পোস্টটি এআই দিয়ে তৈরি করা হতে পারে। আমি যেহেতু বিভাগীয় প্রধান, তারা দাবি করছে আমি লায়েকা ম্যাডামকে সেইভ করেছি।
কোনো রকম কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমি রোববার ক্যাম্পাসেই ছিলাম। বাসায় আসার পর নোটিসটি দেখতে পাই।
শিক্ষার্থীদের এখনকার দাবির বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক কামরুল আহসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সহযোগী অধ্যাপক তাকাদ আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে দুই শিক্ষককে যেভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তার সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দঙ্গলবাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার নিন্দা ও প্রতিবাদ’ শীর্ষক ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু স্বাধীন মত প্রকাশ বা ভিন্ন মত পোষণ করার কারণে অনেক শিক্ষককে হেনস্থা ও হয়রানি করা হচ্ছে এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢালাওভাবে সস্তা ঢাল বানানো হয়েছে। এই প্রবণতারই সর্বশেষ শিকার রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং তাকে সমর্থন করার কারণে ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক এবং বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মহসীন।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, সচেতন মহল মাত্রই জানেন, কলা ও মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনে সমাজের প্রথাগত অনেক বিশ্বাস ও ধারণা নিয়ে একাডেমিকভাবেই ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। শিক্ষকরা সেভাবেই পাঠদান ও জ্ঞানচর্চা করেন। কিন্তু, একজনের সঙ্গে অন্যজনের শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য আছে বলে, সুপরিকল্পিতভাবে ও নানান অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে তাকে চাকুরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ‘দঙ্গলবাজ শিক্ষার্থী’ ও তাদের প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়ে চাকরিচ্যুত দুই শিক্ষককে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।




