আজ ১৮ জানুয়ারি মূকাভিনয় শিল্পী পার্থ প্রতিম মজুমদারের জন্মদিন
দেশের প্রখ্যাত প্রবাসী মূকাভিনয় শিল্পী পার্থ প্রতিম মজুমদারের জন্মদিন আজ। ১৯৫৪ সালের আজকের এই দিনে পাবনা জেলার কালাচাঁদপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মূকাভিনয় বা মাইম শিল্পী হিসেবে তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। বাংলাদেশে মূকাভিনয় শিল্পের সূচনা হয় এই শিল্পীর হাত ধরে।
সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পার্থ প্রতিম মজুমদার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ফ্রান্স সরকারের কাছ থেকে ‘শেভালিয়র’ (নাইট) উপাধি লাভ করেন। এছাড়া তিনি একুশে পদকসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
পার্থ প্রতিম মজুমদারের মূল নাম প্রেমাংশু কুমার বিশ্বাস। তাঁর পিতা হিমাংশু কুমার বিশ্বাস এবং মাতা সুশ্রিকা বিশ্বাস। প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী ওস্তাদ বারীণ মজুমদার ছিলেন তাঁর দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বারীণ মজুমদারের কন্যা নিখোঁজ হলে তাঁর অনুরোধে পার্থ ঢাকায় আসেন। সেই সময় তার নাম রাখা হয় পার্থ প্রতিম মজুমদার।
পার্থ প্রতিম মজুমদারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পাবনার জুবিলী স্কুলে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বড় ভাইদের তত্ত্বাবধানে তিনি কলকাতার নিকটবর্তী চন্দননগরে ড. শীতল প্রসাদ ঘোষ আদর্শ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর জীবনে মূকাভিনয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে, যোগেশ দত্তের সংস্পর্শে এসে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার যোগেশ দত্ত মাইম একাডেমিতে মূকাভিনয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।
১৯৭২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৭৬ সালে ঢাকা মিউজিক কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৮১ ও ১৯৮২ সালে ফ্রান্সে ‘ইকোল দ্য মাইম’-এ আধুনিক কর্পোরাল মাইমের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বখ্যাত মূকাভিনয় শিল্পী মারসেল মার্সোর তত্ত্বাবধানে প্যারিসের ‘ইকোল ইন্টারন্যাশনালি দ্য মাইমোড্রামা দ্য প্যারিস’-এ উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো মূকাভিনয় প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন পার্থ প্রতিম মজুমদার। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪৮টি মূকাভিনয় প্রদর্শন করেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটানোর ফলে বাংলাদেশের মানুষ এই শিল্পীকে প্রায় ভুলতে বসেছিল। ২০০৭ সালে তিনি বাংলাদেশে আসলে পরিচিতি ঘটে দেশের নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয় মূকাভিনয় শিল্পী ও সাংবাদিক নিথর মাহবুবের সঙ্গে। নিথর মাহবুব তার লেখালেখির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন দেশের এই গুণী শিল্পীকে। আবার আলোচনায় চলে আসেন পার্থ প্রতিম মজুমদার। তার পর থেকে তিনি প্রতি বছর একবার করে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন। এই সময় তিনি নাুটুকে থিয়েটারের প্রধান আল নোমান এর সহযোগিতায় সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় থিয়েটার দলের শিল্পীদের নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন। যার ফলে আরও আলোর মুখ দেখতে শুরু করে মূকাভিনয় শিল্প।No photo description available.২০০৭ সালে পার্থ প্রতিম মজুমদার ও নিথর মাহবুব এর প্রথম দেখা। ছবি: সংগৃহীত
তরুণ প্রজন্মকে মূকাভিনয় শেখাতে এবং দেশে মূকাভিনয়কে জনপ্রিয় করতে নিজের দেশে একটি মাইম একাডেমি খোলার পরিকল্পনাও করছিলেন পার্থ প্রতিম। তখন তিনি ছয় মাস ফ্রান্সে এবং ছয় মাস বাংলাদেশে থাকবেন এমনই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মূকাভিনয় দেশে জনপ্রিয় হতে শুরু করলে একটা সুযোগসন্ধানী চক্র দেশের মূকাভিনয়ের ইতিহাস বিকৃত করতে শুরু করে। তারা পার্থ প্রতিম মজুমদার ও নিথর মাহবুবকে পাশকাটিয়ে মূকাভিনয়ের জাগরণের কৃতিত্ব নিজেদের দাবি করে বিগত স্বৈরাচার সরকারের কাছ থেকে নানা ভাবে ফায়দা নিতে শুরু করে। এই চক্র ফায়দা লুটতে গড়ে তোলে মাইমের একাধিক ফেডারেল বডি গড়ে তোলে। এছাড়াও তারা দেশের প্রথম মূকাভিনয় শিল্পী হিসেবে দাবি করতে থাকে অখ্যাত একজনকে। পরে অনেকটা অভিমানেই পার্থ প্রতিম মজুমদার পিছিয়ে যান এবং দেশে আসাও বন্ধ করে দেন। ২০১২ সালে তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশে আসেন।
বিদেশেও তাঁর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্যারিসের বিভিন্ন থিয়েটারে ২৬টি শো করেন তিনি। এ ছাড়া লন্ডন, গ্রিস ও স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে মূকাভিনয় প্রদর্শন করেন। ১৯৮৪ সালে মারসেল মার্সোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং তাঁর নির্দেশনায় একটি মাইমোড্রামায় অংশ নেন। ১৯৮৫ সালে ইতালিতে মারসেল মার্সোর কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে মাসব্যাপী মাইমোড্রামা প্রদর্শন করেন।
পার্থ প্রতিম মজুমদার বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। তাঁর মূকাভিনয় নিয়ে নির্মিত হয়েছে একাধিক ভিডিওচিত্র। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সে বসবাস করছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘মাস্টার অব মাইম’ উপাধি (১৯৮৭), আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (১৯৮৮), লন্ডন বেঙ্গলি লিটারেচার ফেস্টিভালে একমাত্র বাঙালি অতিথি শিল্পী (১৯৮৯), নিউইয়র্ক ফোবানা সম্মেলনে বিশেষ সম্মাননা (২০০০), ফ্রান্সের মোলিয়ার অ্যাওয়ার্ড (২০০৯), একুশে পদক (২০১০) এবং ফ্রান্স সরকারের শেভালিয়র উপাধি (২০১১)।





