গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ‘মহাপরিকল্পনা’: বাস্তবতায় অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বৃহস্পতিবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা ‘মহাপরিকল্পনা’ তুলে ধরে ট্রাম্প প্রশাসন।
এই মহাপরিকল্পনায় একটা পরিকল্পিত শহর ও ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার পাশাপাশি পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে সমুদ্রসৈকতের কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ, ফিলিস্তিনিদের হতাশা ও সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে গাজায় যে বাস্তবতা তৈরি হয়ে আছে, সেই বাস্তবতা থেকে ট্রাম্পের মহাপরিকল্পনার অবস্থান যোজন যোজন দূরে।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার মঞ্চে উঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো চকচকে ভবন দেখান।
প্রায় ১০টি ‘স্লাইড’ দেখিয়ে তিনি বলেন, “যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ৯০ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ থেকে ‘নতুন গাজা’ জন্ম নেবে।
আর ট্রাম্প বলেন, “আমরা গাজার নিরস্ত্রীকরণ, সুশাসন ও সুন্দর পুনর্গঠনের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি পর্ষদ’ সনদে সই করতে মূলত সেদিন দাভোসে জড়ো হয়েছিলেন বিশ্বনেতারা।
শুরুতে গাজা পুনর্গঠনের কাজ তদারকির জন্য এই সনদের কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু পরে সেটি যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর ম্যান্ডেটের কাউন্সিলে রূপ নেয়।
ট্রাম্প বলেন, “গাজায় সফল হলে আমরা অন্য ক্ষেত্রেও এগোতে পারব।”
কুশনারের স্লাইডে থাকা মানচিত্র অনুযায়ী, গাজার ভূমধ্যসাগরীয় পুরো উপকূল বরাদ্দ থাকবে পর্যটনের জন্য। সৈকতজুড়ে ১৮০টি উঁচু টাওয়ার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়।
অন্যান্য এলাকায় শিল্প কমপ্লেক্স, ডেটা সেন্টার ও অত্যাধুনিক উৎপাদনকেন্দ্র এবং পার্ক ও ক্রীড়া স্থাপনা দেখানো হয়েছে।
কুশনার তার মানচিত্রে গাজার মোটামুটি অর্ধেকটাই আবাসিক এলাকা হিসেবে দেখিয়েছেন। কৃষির জন্য তিনি কিছু জায়গা চিহ্নিত করলেও সেগুলো অনুর্বর; ফসল ফলানো কঠিন।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘মহাপরিকল্পনা’ গাজার বাস্তবতার সঙ্গে ব্যাপকভাবে সাংঘর্ষিক।
সেখানকার অর্ধেকের বেশি এলাকা এখনও ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর বাকি অংশে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করছেন গাদাগাদি করে।
সেখানে কেউ থাকছেন অস্থায়ী তাঁবুতে; কেউ বসবাস করছেন ইসরায়েলি বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে।
গাজা পুনর্গঠন: ট্রাম্পের ‘মহাপরিকল্পনার’ সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাকজাতিসংঘের হিসাবে, অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজায় মানবিক সহায়তা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
আর সরবরাহ বাড়ার ফলে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর প্রথমবার ন্যূনতম ক্যালরির চাহিদা পূরণ হয়েছে গাজার বাসিন্দাদের। তবে খাদ্যের দাম বেশি থাকায় অপুষ্টি এখনো সেখানকার জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশকে ভোগাচ্ছে বলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তরফে বলা হয়েছে।
কুশনার বলেন, আগামী ১০০ দিন সেখানে মানবিক সহায়তা ও আশ্রয়ের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
একটি স্লাইডে লেখা ছিল, “পূর্ণ সহায়তা অবিলম্বে গাজায় পাঠানো হবে।”
যদিও সীমান্ত খোলার বিষয়ে ইসরায়েলের সম্মতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন ট্রাম্পের এই উপদেষ্টা।
কুশনার তার উপস্থাপনায় ইসরায়েলনিয়ন্ত্রিত অংশের মধ্য দিয়ে পুনর্গঠন শুরু করার ধারণা দিয়েছেন, যা আরব দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ আরব নেতারা আশঙ্কা করছেন, এটা করতে গিয়ে গাজার অর্ধেকটা স্থায়ীভাবে ইসরায়েলের কব্জায় চলে যেতে পারে।
চার ধাপে গাজা পুনর্গঠনের যে ইঙ্গিত ট্রাম্পের পরিকল্পনায় দেওয়া হয়েছে, তা সেই আশঙ্কা বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে রাফাহ থেকে, যা বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
কুশনার বলেন, গাজায় দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য আবাসন তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে।
ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, গাজা পুনর্গঠনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থ আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ছবি: রয়টার্স।
গাজা পরিচালনার জন্য গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা বড় একটা অগ্রগতি হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ, বিভক্ত ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো এই কমিটি ঘিরে একত্র হয়েছে।
গাজার প্রকৌশলী আলি শাথের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি কায়রোতে বৈঠক শুরু করেছে। হামাস জানিয়েছে, তারা এই গোষ্ঠীর কাছে শাসনভার হস্তান্তরে প্রস্তুত আছে।
দাভোসে ভিডিও বার্তায় তে শাথ বলেন, মিসরের সঙ্গে থাকা রাফাহ ক্রসিং আগামী সপ্তাহে ‘উভয় দিক থেকেই’ খুলে দেওয়া হবে।
ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনাতেও এই ক্রসিং পুনরায় চালুর কথা বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসে গাজার পাশে ইসরায়েলি অভিযান শুরু হলে ক্রসিংটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে হামাসের হাতে থাকা শেষ ইসরায়েলি সেনা গিভিলিকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল সেটি খুলতে চাচ্ছে না।
গাজার জন্য সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লেখেন, “রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলার প্রস্তুতি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।”
তবে ইসরায়েল এতে রাজি কিনা, তা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর এখনও জানায়নি।
এরমধ্যে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, “বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিসভা বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।”
শান্তি পর্ষদের অধীনে থাকা গাজার নির্বাহী কমিটিতে তুরস্ক ও কাতারের মন্ত্রীদের অন্তর্ভুক্তির সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিক।
অনেক ইসরায়েলি হামাসের সঙ্গে এই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তাদের আশঙ্কা, তুরস্ক ও কাতারের সম্পৃক্ততার কারণে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থিরা গাজায় নতুন করে পুরোদমে হামলার আহ্বানে রসদ যুগিয়েছে।
শান্তি পর্ষদের পরিধি নিয়ে ইউরোপের কিছু দেশও উদ্বেগ জানিয়েছে, যারা এখনও এই সনদে সই করেনি।
তবে আরব ও মুসলিম-প্রধান আটটি প্রভাবশালী দেশ যৌথ বিবৃতিতে এই সনদে অংশগ্রহণের কথা বলেছে। তারা জোর দিয়ে এ কথাও বলেছে, এই পর্ষদ যেন ‘অস্থায়ী’ এবং গাজাকেন্দ্রিক হয়।
ছবি: রয়টার্স।
ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি অনেক বদলে যাবে বলে মনে করেন ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক ওফের গুটারম্যান।
তিনি বলেন, “এই ঘোষণা গাজাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে পরিবর্তন আনবে। আগে এটি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের দ্বিপক্ষীয় বিষয় ছিল, কিন্তু এখন এটি আন্তর্জাতিক রূপ পাচ্ছে।”
যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ফিলিস্তিনি ও মিসরীয় প্রতিনিধিদলকে পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষক খালেদ ওকাসা। তিনি মনে করেন, ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক কমিটির ক্ষমতা এখনো ‘অস্পষ্ট’।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, কুশনারের ১০টি স্লাইডের মধ্যে মাত্র একটিতে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের কথা বলা ছিল। আর ওই স্লাইডেই কেবল আরবি লেখা ছিল, যা ছিল উল্টো এবং স্পষ্টভাবে সেটি দেখানো হয়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে গাজার নতুন শাসন কাঠামো কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় কোনো দেশই পুনর্গঠনে অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেনি। কুশনারও তার পরিকল্পনার গাজায় ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেননি।
গত বছর আরব ও মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর এক পরিকল্পনায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
তবে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, এই খরচ ৭ হাজার কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
কুশনার অবশ্য বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ওয়াশিংটনে অর্থায়ন বিষয়ক সম্মেলন করার ঘোষণা আসবে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হলে তাদের নেতাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েল যুদ্ধ শেষ করা বা সেনা প্রত্যাহারে এখনো আগ্রহ দেখায়নি।
সেক্ষেত্রে ইসরায়েল কোনো পদক্ষেপ না নিলে হামাসও অস্ত্র ছাড়বে না বলে মনে করেন খালেদ ওকাসা।
ইসলায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) অপারেশনস ডিভিশনের সাবেক প্রধান ইসরায়েল বলেন, “নেতানিয়াহুর গাজা থেকে সরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই।”
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৪৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
বুধবারও ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত হন। মধ্য গাজার ‘ইয়েলো লাইনের’ অনেক দূরে তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলাটি চালানো হয়।




